ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে লিওনেল মেসিকে থামানো বিশ্বের যেকোনো বাঘা বাঘা রক্ষণভাগের জন্যই এক প্রকার অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। আর নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে সেই চ্যালেঞ্জ যেন আরও কয়েক গুণ বড় হয়ে উঠেছে আফ্রিকার পুঁচকে দেশ কেপ ভার্দের জন্য। তবে প্রতিপক্ষ শিবিরে মেসির মতো অতিমানবীয় তারকা থাকলেও মোটেও নার্ভাস বা উদ্বিগ্ন নন কেপ ভার্দের নির্ভরযোগ্য সেন্টার-ব্যাক রবার্তো ‘পিকে’ লোপেসের মা জুডি লোপেস। বরং তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ম্যাচে বিশ্বসেরাদের একজনকে সামলাতে তাঁর ছেলে পুরোপুরি প্রস্তুত।
চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণেই ফুটবল দুনিয়াকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো জায়ান্টদের নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অব ডেথ’ থেকে অপরাজিত থেকে শেষ ৩২-এর টিকিট কেটেছে দলটি। এবার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে তাদের সামনে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—আলবিসেলেস্তেদের বিপক্ষে মরণপণ লড়াই। আর আর্জেন্টিনার সেই আক্রমণভাগের নেতৃত্বে আছেন চলতি আসরে ইতোমধ্যে দুর্দান্ত ফর্মে থেকে ছয়টি গোল করা ক্ষুদে জাদুকর লিওনেল মেসি।
তবে ছেলের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই মা জুডি লোপেসের। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টসকে (BBC Sport) দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মেসির বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাওয়ায় পিকো (রবার্তো লোপেস) একদমই ভয় পায়নি, বরং ও দারুণ রোমাঞ্চিত। ও খুব শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং চাপের মুহূর্তে নিজের সেরাটা বের করে আনতে জানে। বাইরে কে কী সমালোচনা করছে বা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে কতটা মাতামাতি হচ্ছে, সেসব নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা নেই।”
ছেলের আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জুডি আরও যোগ করেন, “অনেকে হয়তো জানেন না, লোপেস এর আগে দুটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (AFCON) খেলেছে। আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব শ্যামরক রোভার্সের হয়ে প্রায় এক দশক ধরে রক্ষণভাগের মূল কান্ডারি হিসেবে খেলেছে। তাই এমন হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এই ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জটা ও মন থেকে উপভোগ করবে।”
চলতি বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের অভাবনীয় সাফল্যের মূল ভিত্তিই হচ্ছে তাদের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স বা রক্ষণভাগ। গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রাখার পাশাপাশি পুরো গ্রুপ পর্বে তারা মাত্র দুটি গোল হজম করেছে। দলের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার সাথে রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসার নাম ছিলেন এই পিকে লোপেস।
ডাবলিনের একটি স্থানীয় স্কুলে সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত জুডি লোপেস জানান, তিনি কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবেননি তাঁর ছেলে বিশ্বকাপে খেলবে, তাও আবার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার মেসির বিপক্ষে। খানিকটা হাস্যরসের সুরে তিনি বলেন, “হয়তো মেসি নিজেই এখন পিকোর খেলার ভিডিও ফুটেজ দেখছে আর ভাবছে, কীভাবে এই আফ্রিকান রক্ষণপ্রাচীর ভাঙা যায়!”
গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শেষে আয়ারল্যান্ডে নিজের কর্মস্থলে ফিরলেও, নকআউট পর্বের এই মহারণ সরাসরি গ্যালারিতে বসে দেখতে আবারও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উড়াল দিয়েছেন জুডি। ডাবলিন ছাড়ার আগে তাঁর স্কুলের শিক্ষার্থীরা পিকের জন্য একটি বিশেষ উৎসাহমূলক পোস্টার তৈরি করে দেয়, যাতে পরবর্তীতে কেপ ভার্দে দলের সব খেলোয়াড় অটোগ্রাফ দিয়েছেন।
কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনাই যে এই ম্যাচের স্পষ্ট ফেবারিট, তা অকপটে স্বীকার করেন জুডি। তবে ফুটবলের মাঠে যে যেকোনো মুহূর্তে অবিশ্বাস্য চমক বা অঘটন সম্ভব, সেই চিরন্তন বিশ্বাসও তাঁর মনে অটুট। ম্যাচ নিয়ে নিজের শেষ আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে কেপ ভার্দেই গোটা বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রিয় আন্ডারডগ। মাঠে ৯০ মিনিটে ১১ জনের বিপক্ষে ১১ জনই লড়বে। আমার বিশ্বাস, আমাদের এই রূপকথার যাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং আমরা ইতিহাস গড়ব।”

















