ছবি: সংগৃহীত
মাঠে এবং মাঠের বাইরে—একই সঙ্গে দুই দিকেই ইতিহাসের অন্যতম চরম ও নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। একদিকে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে মিশরের বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের বিতর্কিত ও নাটকীয় জয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের তীব্র সমালোচনা থামছেই না; ঠিক তার মাঝেই সংস্থাটির শত শত মিলিয়ন ডলারের সন্দেহজনক ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের তদন্তে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। বিশ্বকাপ চলাকালীন খোদ মার্কিন মাটিতেই এএফএ-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন তদন্তে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব ফুটবলে।
আর্জেন্টাইন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘লা নাসিওন’ (La Nación) এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গণমাধ্যম ‘ফক্স স্পোর্টস মেক্সিকো’-এর যৌথ বরাতে জানা গেছে, এএফএ সভাপতি ক্লাউডিও “চিকি” তাপিয়ার নেতৃত্বাধীন এই ফুটবল ফেডারেশন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ) এবং এফবিআইয়ের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ও ব্যাঙ্কিং চ্যানেল ব্যবহার করে কীভাবে শত শত মিলিয়ন ডলার লেনদেন করা হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো ধরণের আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার (Money Laundering) কিংবা বড় ধরনের ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছেন মার্কিন তদন্তকারীরা।
মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রশাসনের মূল নজর এখন ফ্লোরিডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ট্যুরপ্রোড এন্টার এলএলসি’-এর দিকে। মূলত বিদেশে এএফএ-এর সমস্ত আর্থিক চুক্তি, স্পন্সরশিপ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে রয়েছে এই রহস্যময় প্রতিষ্ঠানটি। লা নাসিওন-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিটিব্যাংক, ব্যাংক অব আমেরিকা এবং জেপি মরগানের মতো পাঁচটি শীর্ষ মার্কিন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অন্তত ২৬০ মিলিয়ন ডলারের সন্দেহজনক লেনদেন করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের মাত্র একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের প্রকৃত পরিচালন বা যাতায়াত ব্যয়ে খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাকি অর্থের মধ্যে প্রায় ৫৭ মিলিয়ন ডলার এমন কিছু নামসর্বস্ব ও ভুয়া (Shell Company) কোম্পানি এবং সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে পাচার করা হয়েছে, যার কোনো বৈধ অর্থনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। এমনকি কোনো দৃশ্যমান সেবা প্রদান ছাড়াই কোটি কোটি ডলার চলে গেছে বুয়েনস আইরেস এবং বারিলোচে শহরের এমন কিছু রহস্যময় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে, যারা কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার সরকারি সামাজিক অনুদান (Social Welfare) পেয়ে থাকেন।
৫৮ বছর বয়সী শক্তিশালী ফুটবল সংগঠক ক্লাউডিও “চিকি” তাপিয়া শুধু এই আন্তর্জাতিক তদন্তই নয়, নিজ দেশেও এখন মারাত্মক রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল ক্লাবগুলোর ঐতিহ্যগত মালিকানা কাঠামো ভেঙে সেগুলোকে প্রাইভেট কোম্পানিতে রূপান্তর করা নিয়ে দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছেন তিনি। এই তীব্র বিরোধের জের ধরে মিলেই সরকারের দায়ের করা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে তাপিয়ার বিরুদ্ধে ট্যাক্স বা কর ফাঁকির আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি বুয়েনস আইরেসে মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একটি প্রীতি ম্যাচের আগে মাঠে যখন তাপিয়াকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হচ্ছিল, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত নিজ দেশের সমর্থকরাই তাকে লক্ষ্য করে তীব্র ‘ভুয়ো ভুয়ো’ ধ্বনি ও দুয়ো দেন।
আসলে বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই তাপিয়া এবং এএফএ-এর বিরুদ্ধে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাড়ছিল। ঘরোয়া লিগের নিয়মকানুনে অজনপ্রিয় পরিবর্তন, একের পর এক দুর্নীতির তদন্ত এবং বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ হিসেবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও নিচু র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজন—এসব কারণে সমর্থকদের বড় একটি অংশ তাপিয়ার পদত্যাগের দাবিতে মুখর ছিলেন। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহে মিশরের বিপক্ষে সাম্প্রতিক বিতর্কিত জয় পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এই জটিল ও হাই-প্রোফাইল আর্থিক লেনদেনের তদন্তে মার্কিন বিচার বিভাগের তিন তুখোড় ও অভিজ্ঞ প্রসিকিউটর প্যাট্রিক গুশু, ক্রিস্টোফার টিং এবং মাইকেল বার্জার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এদিকে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে এএফএ-এর প্যানেল আইনজীবীরা বলেছেন, প্রাথমিক তদন্ত শুরু হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন স্বাগতিক দেশেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ফুটবল ফেডারেশনের ওপর এফবিআইয়ের এই সাঁড়াশি অভিযান বিশ্ব ফুটবলে আরেকটি ‘ফিফা গেট’ বা বড় কেলেঙ্কারির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।















