ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচন: নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বনাম পুরোনো বলয়ের চ্যালেঞ্জ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পরীক্ষা

২০২৬-এর নির্বাচন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ- সংষ্কার না কি ক্ষমতার পালাবদল?

বাংলাদেশ বর্তমানে তার ইতিহাসের এক অনন্য ও জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির পথে। ১২ ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, জনমনে প্রশ্ন তত জোরালো হচ্ছে- এই নির্বাচন কি কেবল একটি প্রথাগত ক্ষমতার রদবদল, না কি রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম দেখেছিল, তার বাস্তবায়ন? বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন নতুন ও পুরাতন শক্তির এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দান। একদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাবর্তনের আকুলতা, অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের কারিগরদের ‘সিস্টেম পরিবর্তনের’ আকাঙ্ক্ষা- এই দুইয়ের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ।

 

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটা ‘সংস্কার’ ও ‘নির্বাচন’- এই দুটি সমান্তরাল লাইনের ওপর নির্ভরশীল। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ যেমন- বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনে আমূল পরিবর্তনের যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, তা একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে অস্থিরতা ও আগাম বিজয়োল্লাস দেখা যাচ্ছে, তা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং দখলদারিত্বের পুরোনো সংস্কৃতি যদি ফিরে আসে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর ধারণাটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এবারের নির্বাচনে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে একটি গভীর বিচারবুদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে তারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং প্রার্থীর চারিত্রিক স্বচ্ছতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

 

নির্বাচনী প্রচারণায় এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তরুণ ভোটারদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী যখন ৩০০ আসনের জন্য লড়ছেন, তখন ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি বা ‘ইশতেহারের লড়াই’ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বেকারত্ব দূরীকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের যে রূপরেখা তারেক রহমান বা জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের মতো শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসছে, তা নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন গৎবাঁধা স্লোগান থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি তৃতীয় শক্তির উত্থান বা ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রক্রিয়াটি প্রচলিত দ্বিদলীয় বলয় ভেঙে একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।

 

পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও একটি বড় বার্তা বহন করবে। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে কেবল ব্যালট বাক্সে সিল মারাই যথেষ্ট নয়, বরং নির্বাচনের পর জয়ী দল কীভাবে পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখে এবং সংষ্কারের ধারা অব্যাহত রাখে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পরিবারতন্ত্র ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে ব্যর্থ হয়, তবে জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের ওপর, যেখানে বিচার হবে সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতার মালিক হবে প্রকৃতপক্ষেই সাধারণ জনগণ।

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন মোজতবা খামেনি

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচন: নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বনাম পুরোনো বলয়ের চ্যালেঞ্জ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পরীক্ষা

২০২৬-এর নির্বাচন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ- সংষ্কার না কি ক্ষমতার পালাবদল?

Update Time : ১২:৩২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ বর্তমানে তার ইতিহাসের এক অনন্য ও জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির পথে। ১২ ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, জনমনে প্রশ্ন তত জোরালো হচ্ছে- এই নির্বাচন কি কেবল একটি প্রথাগত ক্ষমতার রদবদল, না কি রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম দেখেছিল, তার বাস্তবায়ন? বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন নতুন ও পুরাতন শক্তির এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দান। একদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাবর্তনের আকুলতা, অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের কারিগরদের ‘সিস্টেম পরিবর্তনের’ আকাঙ্ক্ষা- এই দুইয়ের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ।

 

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটা ‘সংস্কার’ ও ‘নির্বাচন’- এই দুটি সমান্তরাল লাইনের ওপর নির্ভরশীল। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ যেমন- বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনে আমূল পরিবর্তনের যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, তা একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে অস্থিরতা ও আগাম বিজয়োল্লাস দেখা যাচ্ছে, তা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং দখলদারিত্বের পুরোনো সংস্কৃতি যদি ফিরে আসে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর ধারণাটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এবারের নির্বাচনে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে একটি গভীর বিচারবুদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে তারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং প্রার্থীর চারিত্রিক স্বচ্ছতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

 

নির্বাচনী প্রচারণায় এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তরুণ ভোটারদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী যখন ৩০০ আসনের জন্য লড়ছেন, তখন ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি বা ‘ইশতেহারের লড়াই’ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বেকারত্ব দূরীকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের যে রূপরেখা তারেক রহমান বা জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের মতো শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসছে, তা নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন গৎবাঁধা স্লোগান থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি তৃতীয় শক্তির উত্থান বা ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রক্রিয়াটি প্রচলিত দ্বিদলীয় বলয় ভেঙে একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।

 

পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও একটি বড় বার্তা বহন করবে। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে কেবল ব্যালট বাক্সে সিল মারাই যথেষ্ট নয়, বরং নির্বাচনের পর জয়ী দল কীভাবে পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখে এবং সংষ্কারের ধারা অব্যাহত রাখে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পরিবারতন্ত্র ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে ব্যর্থ হয়, তবে জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের ওপর, যেখানে বিচার হবে সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতার মালিক হবে প্রকৃতপক্ষেই সাধারণ জনগণ।