ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ–রাজনৈতিক সমীকরণ এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া ত্রিমুখী সংঘাত এখন এক চরম উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু হয়েছে বড় ধরণের কম্পন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭০ ডলারের নিচে।
এই যুদ্ধের আগুণের আঁচ সরাসরি এসে লাগছে বাংলাদেশের গায়ে। রোববার (৮ মার্চ, ২০২৬) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য এভিয়েশন ফুয়েলের দাম প্রতি লিটারে ৩.৬২ টাকা বৃদ্ধি করে ১১২.৪১ টাকা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। বিইআরসি স্পষ্ট জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে প্লাটসের রেট বৃদ্ধি এবং ডলারের ক্রমবর্ধমান বিনিময় হার এই মূল্য সমন্বয়ের প্রধান কারণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল এভিয়েশন ফুয়েলেই কি এই ধাক্কা সীমাবদ্ধ থাকবে?
হরমুজ প্রণালি: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নাভি হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। আমাদের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এই সরু জলপথ দিয়ে আমদানিকৃত। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা জাহাজগুলো যদি এই রুট দিয়ে চলাচল করতে না পারে, তবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কলকারখানার চাকা সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে বাজারে ডিজেল ও অকটেনের সরবরাহ নিয়ে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি তেলের দাম ১২০ বা ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকে, তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে ভয়াবহ চাপ পড়বে, তা সামলানো সরকারের জন্য হিমশিম খাওয়ার মতো বিষয় হবে।
জনজীবনে বহুমুখী প্রভাব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর চেইন রিয়েকশন সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। এভিয়েশন ফুয়েলের দাম বাড়ায় বিমান ভাড়া বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে প্রবাসী শ্রমিক ও পর্যটন খাতে। একইভাবে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, যা সরাসরি নিত্যপণ্যের দামকে আরও আকাশচুম্বী করে তুলবে। এর ফলে আগে থেকেই থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে পারে, যা আমাদের পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই কিছু কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।
উপসংহার ও সুপারিশ: ১. বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান: কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অন্য উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করতে হবে। ২. কৌশলগত মজুত: আপদকালীন সংকট মোকাবিলায় অন্তত ২–৩ মাসের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। ৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের ওপর বিনিয়োগ কয়েকগুণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল যদি প্রশমিত না হয়, তবে আমাদের সামনে এক কঠিন অর্থনৈতিক অন্ধকার অপেক্ষা করছে। সময় থাকতেই সতর্ক না হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সম্পাদকীয় ডেস্ক 















