শরীফ ওসমান হাদির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল আর শোকাতুর পরিবেশ কেবল একটি বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী ছিল না; বরং তা ছিল বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে এক গভীর পরিবর্তনের সংকেত। সময়ের আবর্তে গণমানুষের শোক স্তিমিত হওয়া চিরন্তন নিয়ম হলেও, হাদির ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যতিক্রমী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যেমন একটি রাজনৈতিক পতনের সূচনা করেছিল, হাদির মৃত্যু তেমনই এক অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক লড়াইকে নতুন করে উসকে দিয়েছে—যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘হাদি ইফেক্ট’।
হাদির শক্তিমত্তা তাঁর দেহজ আকৃতিতে ছিল না, ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ ও ঋজু ভাষায়। তিনি তথাকথিত শহুরে অভিজাতদের পরিশীলিত ঢংয়ে কথা বলতেন না; তাঁর ভাষায় ফুটে উঠত গ্রামবাংলার প্রান্তিক ও সরল অথচ ধারালো সুর। মাদ্রাসা শিক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বেড়ে ওঠা এবং নিম্ন–মধ্যবিত্ত পারিবারিক প্রেক্ষাপট তাকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম করেছিল। তাঁর এই পরিচয়ই তাঁকে গতানুগতিক রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মূলত হাদির লড়াইটি ছিল দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত এককেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বয়ানের বিরুদ্ধে। গত কয়েক দশকে মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে নির্দিষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, হাদি তার সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়েও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অবসান ঘটানো বেশি জরুরি। তাঁর মৃত্যু সেই সব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিসরে নিজেদের অবহেলিত মনে করে আসছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর হাদির ব্যক্তিত্ব যতটা বড় হয়ে উঠেছে, তাঁর আদর্শিক শক্তি ঠিক ততটাই প্রভাব বিস্তার করছে। যদিও অনেকে তাঁর নাম ও ছবি ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন, কিন্তু হাদি যে ‘সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন’ এবং ‘অভিজাততন্ত্রের বাইরে’ কথা বলার পথ দেখিয়ে গেছেন, তা এখনো এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবে জাতীয় বিবেকে নাড়া দিচ্ছে। জনগণের আবেগ হয়তো সময়ের সাথে ফিকে হবে, কিন্তু হাদি যে অসমাপ্ত লড়াইয়ের বীজ বপন করেছেন, তা বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্পাদকীয় ডেস্ক 

























