ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শেষটা হলো রূপকথার মতো: শিরোপার রঙে সাদিও মানের বিদায়ী রাঙানো

মাঠ ছাড়ছিল দল, একা দাঁড়িয়ে সম্মান বাঁচালেন মানে: সেনেগালের নাটকীয় শিরোপা জয়ের নেপথ্যে

চার বছর আগে সেনেগালকে প্রথমবার মহাদেশ সেরার মুকুট পরিয়েছিলেন তিনি। ২০২৬ সালের এই রোববারে রাবাতের গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে আবারও আফ্রিকান নেশন্স কাপের (AFCON) শিরোপা পুনরুদ্ধার করলেন সাদিও মানে। তবে এবারের জয়টি কেবল ফুটবলের নৈপুণ্যে নয়, মানের অনন্য নেতৃত্ব এবং অবিশ্বাস্য এক ‘স্পোর্টসম্যানশিপের’ গল্প হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসে।

স্বাগতিক মরক্কোর দাপট ও মাঠের লড়াই

নিজেদের মাঠে ফাইনালের আগে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল মরক্কো। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দুই দলই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে দর্শকদের রোমাঞ্চ উপহার দেয়। তবে গোলশূন্য সমতায় ম্যাচ যখন যোগ করা সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) গড়ায়, তখনই শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়।

গোল বাতিল বনাম বিতর্কিত পেনাল্টি

যোগ করা সময়ের ৮ মিনিটের মাথায় ইসমাইল সার জাল খুঁজে পেলেও রেফারি ফাউলের অজুহাতে গোলটি বাতিল করেন। এর ঠিক তিন মিনিট পর ডি-বক্সের ভেতর ব্রাহিম দিয়াস ফাউলের শিকার হলে ভিএআর (VAR) দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। গোলবঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ আর শেষ মুহূর্তের এই পেনাল্টি মেনে নিতে পারেনি সেনেগাল।

মাঠ ছেড়ে টানেলে সেনেগাল: ত্রাতা সাদিও মানে

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ক্ষুব্ধ সেনেগাল কোচ পাপ চাও তার শিষ্যদের মাঠ ছেড়ে চলে আসার নির্দেশ দেন। ইদ্রিসা গেয়ি, মঁদিরা যখন ড্রেসিংরুমের টানেলে ঢুকে পড়ছেন, তখন মাঝমাঠে একা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী সাদিও মানে।

মাঠে থাকা কিংবদন্তি কোচ ক্লুদ লু রওয়ার পরামর্শ চান মানে। লু রওয়া বলেন, “সাদিও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কী করা উচিত। আমি তাকে শুধু বলেছিলাম—তোমার সতীর্থদের ফিরিয়ে আনো।” মানে সেটাই করেন। একা গিয়ে পুরো দলকে বুঝিয়ে মাঠে ফিরিয়ে আনেন তিনি। তার এই দূরদর্শিতা সেনেগালকে এক নিশ্চিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অপমানের হাত থেকে রক্ষা করে।

ব্রাহিম দিয়াসের ভুল ও সেনেগালের জয়োল্লাস

১৪ মিনিটের দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে খেলা শুরু হলে পেনাল্টি নিতে আসেন ব্রাহিম দিয়াস। তবে স্নায়ুচাপে ভেঙে পড়ে অত্যন্ত দুর্বল এক ‘পানেঙ্কা’ শট নেন তিনি, যা সহজেই রুখে দেন এদুয়াঁ মঁদি।

মানসিকভাবে এগিয়ে যাওয়া সেনেগাল অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই (৯৪ মিনিট) গোল পেয়ে যায়। ইদ্রিসা গেয়ির বাড়ানো থ্রু বল ধরে বুলেট গতির শটে লক্ষ্যভেদ করেন পাপ গেয়ি। এই এক গোলই শেষ পর্যন্ত সেনেগালকে এনে দেয় পরম আরাধ্য শিরোপা।

বিদায় বেলাতেও মহানায়ক

টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিতে গিয়ে সাদিও মানে নিশ্চিত করেন নিজের অবসরের কথা। তিনি বলেন:

“এটাই আমার শেষ আফ্রিকান নেশন্স কাপ। আমি আগেই বলেছিলাম এখানেই থামব। পরবর্তী প্রজন্ম এখন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, আমি এখন থেকে দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় (সমর্থক) হয়ে থাকব।”

মাঠের লড়াইয়ে গোল আর মাঠের বাইরের লড়াইয়ে ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে সাদিও মানে আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি কেবল সেনেগালের নয়, গোটা আফ্রিকার ফুটবলের সম্রাট।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

শেষটা হলো রূপকথার মতো: শিরোপার রঙে সাদিও মানের বিদায়ী রাঙানো

মাঠ ছাড়ছিল দল, একা দাঁড়িয়ে সম্মান বাঁচালেন মানে: সেনেগালের নাটকীয় শিরোপা জয়ের নেপথ্যে

Update Time : ১০:৪৩:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

চার বছর আগে সেনেগালকে প্রথমবার মহাদেশ সেরার মুকুট পরিয়েছিলেন তিনি। ২০২৬ সালের এই রোববারে রাবাতের গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে আবারও আফ্রিকান নেশন্স কাপের (AFCON) শিরোপা পুনরুদ্ধার করলেন সাদিও মানে। তবে এবারের জয়টি কেবল ফুটবলের নৈপুণ্যে নয়, মানের অনন্য নেতৃত্ব এবং অবিশ্বাস্য এক ‘স্পোর্টসম্যানশিপের’ গল্প হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসে।

স্বাগতিক মরক্কোর দাপট ও মাঠের লড়াই

নিজেদের মাঠে ফাইনালের আগে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল মরক্কো। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দুই দলই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে দর্শকদের রোমাঞ্চ উপহার দেয়। তবে গোলশূন্য সমতায় ম্যাচ যখন যোগ করা সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) গড়ায়, তখনই শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়।

গোল বাতিল বনাম বিতর্কিত পেনাল্টি

যোগ করা সময়ের ৮ মিনিটের মাথায় ইসমাইল সার জাল খুঁজে পেলেও রেফারি ফাউলের অজুহাতে গোলটি বাতিল করেন। এর ঠিক তিন মিনিট পর ডি-বক্সের ভেতর ব্রাহিম দিয়াস ফাউলের শিকার হলে ভিএআর (VAR) দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। গোলবঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ আর শেষ মুহূর্তের এই পেনাল্টি মেনে নিতে পারেনি সেনেগাল।

মাঠ ছেড়ে টানেলে সেনেগাল: ত্রাতা সাদিও মানে

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ক্ষুব্ধ সেনেগাল কোচ পাপ চাও তার শিষ্যদের মাঠ ছেড়ে চলে আসার নির্দেশ দেন। ইদ্রিসা গেয়ি, মঁদিরা যখন ড্রেসিংরুমের টানেলে ঢুকে পড়ছেন, তখন মাঝমাঠে একা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী সাদিও মানে।

মাঠে থাকা কিংবদন্তি কোচ ক্লুদ লু রওয়ার পরামর্শ চান মানে। লু রওয়া বলেন, “সাদিও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কী করা উচিত। আমি তাকে শুধু বলেছিলাম—তোমার সতীর্থদের ফিরিয়ে আনো।” মানে সেটাই করেন। একা গিয়ে পুরো দলকে বুঝিয়ে মাঠে ফিরিয়ে আনেন তিনি। তার এই দূরদর্শিতা সেনেগালকে এক নিশ্চিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অপমানের হাত থেকে রক্ষা করে।

ব্রাহিম দিয়াসের ভুল ও সেনেগালের জয়োল্লাস

১৪ মিনিটের দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে খেলা শুরু হলে পেনাল্টি নিতে আসেন ব্রাহিম দিয়াস। তবে স্নায়ুচাপে ভেঙে পড়ে অত্যন্ত দুর্বল এক ‘পানেঙ্কা’ শট নেন তিনি, যা সহজেই রুখে দেন এদুয়াঁ মঁদি।

মানসিকভাবে এগিয়ে যাওয়া সেনেগাল অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই (৯৪ মিনিট) গোল পেয়ে যায়। ইদ্রিসা গেয়ির বাড়ানো থ্রু বল ধরে বুলেট গতির শটে লক্ষ্যভেদ করেন পাপ গেয়ি। এই এক গোলই শেষ পর্যন্ত সেনেগালকে এনে দেয় পরম আরাধ্য শিরোপা।

বিদায় বেলাতেও মহানায়ক

টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিতে গিয়ে সাদিও মানে নিশ্চিত করেন নিজের অবসরের কথা। তিনি বলেন:

“এটাই আমার শেষ আফ্রিকান নেশন্স কাপ। আমি আগেই বলেছিলাম এখানেই থামব। পরবর্তী প্রজন্ম এখন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, আমি এখন থেকে দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় (সমর্থক) হয়ে থাকব।”

মাঠের লড়াইয়ে গোল আর মাঠের বাইরের লড়াইয়ে ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে সাদিও মানে আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি কেবল সেনেগালের নয়, গোটা আফ্রিকার ফুটবলের সম্রাট।