ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যিকারের বন্ধন বনাম মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধার সূক্ষ্ম তফাত জানালেন মনোবিদরা

‘ভ্যালিডেইশন ডেটিং’: মনের মানুষ নাকি ইগো তৃপ্তির খোঁজে?

সংগৃহীত ছবি

 

ডিজিটাল ডেটিং বা আধুনিক অ্যাপের যুগে অনেকেই নিয়মিত নতুন সম্পর্কের জন্য নিজেদের উন্মুখ রাখেন। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, ঠিক কী কারণে আপনি ডেটিং করছেন কিংবা নতুন কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছেন? আপনি কি সত্যিই মনের মানুষের সঙ্গে একটি নিবিড় আত্মিক বন্ধন খুঁজছেন, নাকি কেবল নিজের অহং বা ‘ইগো’কে তৃপ্ত করতে অপরের কাছ থেকে একটু প্রশংসা ও মনোযোগ তথা ‘ভ্যালিডেইশন’ পাওয়ার চেষ্টা করছেন? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সত্যিকারের সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা আর কেবলই ‘মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধা’ বা ‘ভ্যালিডেইশন ডেটিংয়ে’র মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তবে গভীর পার্থক্য।

 

আন্তর্জাতিক ডেটিং অ্যাপ ‘হিঞ্জ’-এর সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন ফ্যামিলি থেরাপিস্ট মো আরি ব্রাউন বলেন, যখন কেউ মানুষের চেয়ে ‘পার্টনার’ পাওয়ার ভাবনাকে বড় করে দেখেন, তখন তিনি বাস্তবে নয়, বরং কল্পনায় বাস করেন। সত্যিকারের আগ্রহ সবসময় সামনের মানুষটির বাস্তব রূপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়; তাকে কোনো সস্তা রূপকথার চরিত্র ভাবলে চলে না। অনেক সময় দেখা যায়, সামনাসামনি থাকলে চমৎকার রসায়ন জমলেও দূরে গেলেই সেই আগ্রহ উবে যায়। নিউ ইয়র্কের ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞানী ডা. সাবরিনা রোমানফ এটিকে ‘পারফর্মেটিভ কেমিস্ট্রি’ বা কৃত্রিম রসায়ন বলে অভিহিত করেছেন। এর মানে হলো, আপনি আসলে কেবল সেই মুহূর্তের মনোযোগটুকুই উপভোগ করছেন, মানুষটির প্রতি কোনো প্রকৃত আবেগীয় টান আপনার নেই।

 

 

আবার পরিচয়ের শুরুতেই নিজের সব অতীত কষ্ট বা ‘ট্রমা’ একসঙ্গে উজাড় করে দেওয়া, কিংবা টেক্সটে দিনরাত চ্যাটিং করলেও বাস্তবে দেখা করায় অনীহা প্রকাশ করা— ভ্যালিডেইশন ডেটিংয়ের অন্যতম বড় লক্ষণ। ডা. রোমানফের মতে, যারা শুধুই নিজের অহংকার বাড়াতে চান, তারা অপর মানুষকে ঝুলিয়ে রাখতে ভালোবাসেন এবং নিজের একাকীত্ব বা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য খেয়াল-খুশি মতো অন্যের জীবনে আসা-যাওয়া করেন। একইভাবে, লং আইল্যান্ডের মনোবিদ ড্যানিয়েল ম্যাডোনা জানান, যারা সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়তে চান না, তারা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে একই ছকে ও একই কায়দায় কথা বলেন, যাতে ডজন ডজন মানুষের মনোযোগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখা যায়। এদের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তাকে ‘তাড়া’ করার বা জয় করার আনন্দটাই প্রধান হয়ে ওঠে।

 

 

এই নেতিবাচক চক্র থেকে বের হওয়ার উপায়ও বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মো আরি ব্রাউন বলেন, প্রথম কাজ হলো নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করা। অন্যের মাধ্যমে প্রশংসিত হতে চাওয়া খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে এবার ডেটিংয়ে গিয়ে অপর মানুষটি আপনাকে পছন্দ করছে কি-না, সেই চিন্তায় মগ্ন না থেকে নিজেকে কিছু বাস্তব প্রশ্ন করুন— ‘আমি কি এই মানুষটার পাশে স্বস্তি পাচ্ছি?’, ‘আমি কি সত্যি তাকে জানতে আগ্রহী?’। যখন অন্য সবার মতামত বা সামাজিক স্বীকৃতির পর্দা সরিয়ে কেবল নিজের ভালো লাগার পাশাপাশি সামনের মানুষটিকেও সমান প্রাধান্য দিতে পারবেন, তখনই কৃত্রিম পারফরম্যান্সের বদলে জন্ম নেবে একটি খাঁটি ও সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্ক।

 

 

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

সত্যিকারের বন্ধন বনাম মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধার সূক্ষ্ম তফাত জানালেন মনোবিদরা

‘ভ্যালিডেইশন ডেটিং’: মনের মানুষ নাকি ইগো তৃপ্তির খোঁজে?

Update Time : ১১:৫১:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

ডিজিটাল ডেটিং বা আধুনিক অ্যাপের যুগে অনেকেই নিয়মিত নতুন সম্পর্কের জন্য নিজেদের উন্মুখ রাখেন। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, ঠিক কী কারণে আপনি ডেটিং করছেন কিংবা নতুন কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছেন? আপনি কি সত্যিই মনের মানুষের সঙ্গে একটি নিবিড় আত্মিক বন্ধন খুঁজছেন, নাকি কেবল নিজের অহং বা ‘ইগো’কে তৃপ্ত করতে অপরের কাছ থেকে একটু প্রশংসা ও মনোযোগ তথা ‘ভ্যালিডেইশন’ পাওয়ার চেষ্টা করছেন? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সত্যিকারের সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা আর কেবলই ‘মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধা’ বা ‘ভ্যালিডেইশন ডেটিংয়ে’র মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তবে গভীর পার্থক্য।

 

আন্তর্জাতিক ডেটিং অ্যাপ ‘হিঞ্জ’-এর সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন ফ্যামিলি থেরাপিস্ট মো আরি ব্রাউন বলেন, যখন কেউ মানুষের চেয়ে ‘পার্টনার’ পাওয়ার ভাবনাকে বড় করে দেখেন, তখন তিনি বাস্তবে নয়, বরং কল্পনায় বাস করেন। সত্যিকারের আগ্রহ সবসময় সামনের মানুষটির বাস্তব রূপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়; তাকে কোনো সস্তা রূপকথার চরিত্র ভাবলে চলে না। অনেক সময় দেখা যায়, সামনাসামনি থাকলে চমৎকার রসায়ন জমলেও দূরে গেলেই সেই আগ্রহ উবে যায়। নিউ ইয়র্কের ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞানী ডা. সাবরিনা রোমানফ এটিকে ‘পারফর্মেটিভ কেমিস্ট্রি’ বা কৃত্রিম রসায়ন বলে অভিহিত করেছেন। এর মানে হলো, আপনি আসলে কেবল সেই মুহূর্তের মনোযোগটুকুই উপভোগ করছেন, মানুষটির প্রতি কোনো প্রকৃত আবেগীয় টান আপনার নেই।

 

 

আবার পরিচয়ের শুরুতেই নিজের সব অতীত কষ্ট বা ‘ট্রমা’ একসঙ্গে উজাড় করে দেওয়া, কিংবা টেক্সটে দিনরাত চ্যাটিং করলেও বাস্তবে দেখা করায় অনীহা প্রকাশ করা— ভ্যালিডেইশন ডেটিংয়ের অন্যতম বড় লক্ষণ। ডা. রোমানফের মতে, যারা শুধুই নিজের অহংকার বাড়াতে চান, তারা অপর মানুষকে ঝুলিয়ে রাখতে ভালোবাসেন এবং নিজের একাকীত্ব বা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য খেয়াল-খুশি মতো অন্যের জীবনে আসা-যাওয়া করেন। একইভাবে, লং আইল্যান্ডের মনোবিদ ড্যানিয়েল ম্যাডোনা জানান, যারা সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়তে চান না, তারা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে একই ছকে ও একই কায়দায় কথা বলেন, যাতে ডজন ডজন মানুষের মনোযোগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখা যায়। এদের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তাকে ‘তাড়া’ করার বা জয় করার আনন্দটাই প্রধান হয়ে ওঠে।

 

 

এই নেতিবাচক চক্র থেকে বের হওয়ার উপায়ও বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মো আরি ব্রাউন বলেন, প্রথম কাজ হলো নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করা। অন্যের মাধ্যমে প্রশংসিত হতে চাওয়া খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে এবার ডেটিংয়ে গিয়ে অপর মানুষটি আপনাকে পছন্দ করছে কি-না, সেই চিন্তায় মগ্ন না থেকে নিজেকে কিছু বাস্তব প্রশ্ন করুন— ‘আমি কি এই মানুষটার পাশে স্বস্তি পাচ্ছি?’, ‘আমি কি সত্যি তাকে জানতে আগ্রহী?’। যখন অন্য সবার মতামত বা সামাজিক স্বীকৃতির পর্দা সরিয়ে কেবল নিজের ভালো লাগার পাশাপাশি সামনের মানুষটিকেও সমান প্রাধান্য দিতে পারবেন, তখনই কৃত্রিম পারফরম্যান্সের বদলে জন্ম নেবে একটি খাঁটি ও সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্ক।