ছবি : সংগৃহীত
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লিতে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ শিশু থেকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হয়ে ওঠার কারিগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মদিন আজ। ১৯২০ সালের এই দিনে (১৭ মার্চ) শেখ লুৎফর রহমান এবং সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন ইতিহাসের এই মহানায়ক। আজ দেশজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ ও এই মহান নেতার জন্মবার্ষিকী।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ছিল ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। কৈশোর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এই নেতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলেই। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়ার সময় প্রতিবাদী চেতনার কারণে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করতে হয় তাকে, যা ছিল তাঁর দীর্ঘ কারাজীবনের সূচনা মাত্র। পরবর্তীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো প্রখ্যাত নেতাদের সান্নিধ্যে এসে ছাত্র রাজনীতিতে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৫২–র ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রথম সোপান।
১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা, যা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় বঙ্গবন্ধুকে বাঙালির একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই কালজয়ী ভাষণ- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম“— স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে পুরো জাতিকে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার মুখে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর যখন বিজয় অর্জিত হয়, তখনো তিনি পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে বন্দি ছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হন বঙ্গবন্ধু। শূন্য হাতে একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করার পাশাপাশি তিনি উপহার দেন একটি বিশ্বমানের সংবিধান। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর সেই স্বপ্নযাত্রা থমকে যায়। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো ব্যয় করেছেন কারান্তরালে। তথ্যমতে, তিনি মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের মধ্যে প্রায় ১৩ বছরই তাঁকে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে, যার মধ্যে আটটি জন্মদিন কেটেছে নিঃসঙ্গ কারাপ্রকোষ্ঠে।
ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু কখনো আড়ম্বর পছন্দ করতেন না। অত্যন্ত সাদামাটাভাবে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে দিনটি কাটাতে ভালোবাসতেন তিনি। তিনি বলতেন, “জনগণের কল্যাণেই আমার প্রকৃত আনন্দ।” আজ টুঙ্গিপাড়া থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাদের প্রিয় ‘মুজিব ভাই’কে স্মরণ করছে। তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই হোক আজকের দিনের প্রধান অঙ্গীকার।

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা 















