সংগৃহীত ছবি
আধুনিক জীবনযাত্রা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। একসময় ভাবা হতো এগুলো কেবল বয়স্কদের রোগ, কিন্তু এখন বয়স ৩০ পার হতেই কিংবা তার চেয়েও অল্পবয়সীদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে হার্টের নানা জটিলতা। তবে চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো ‘হার্ট অ্যাটাক’ এবং ‘স্ট্রোক’ নিয়ে এক ধরণের বিভ্রান্তি কাজ করে। অনেকেই এই দুটিকে এক মনে করেন, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল ডেকে আনতে পারে।
আসলে রোগ দুটির উৎপত্তিস্থল সম্পূর্ণ আলাদা। হার্ট অ্যাটাক প্রধানত হৃদযন্ত্র বা হার্টের সমস্যা। যখন হার্টের পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনী কোনো কারণে ব্লক হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, তখন হার্ট অ্যাটাক ঘটে। অন্যদিকে, স্ট্রোক হলো সম্পূর্ণভাবে মস্তিষ্কের বা নিউরো-সংক্রান্ত একটি জরুরি অবস্থা। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে (ব্লকেজ) কিংবা রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হলে মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেন পায় না। ফলে কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যেতে শুরু করে—একে স্ট্রোক বলে।
উভয় পরিস্থিতিই অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তবে দ্রুত লক্ষণ সনাক্ত করতে পারলে রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সহজে চেনার উপায়: লক্ষণের পার্থক্য
নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল রাখলে প্রাথমিকভাবে ঘরে বসেই অনুমান করা সম্ভব রোগী কোন সংকটে ভুগছেন:
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণসমূহ:
- বুকে প্রচণ্ড চাপ: বুকের মাঝখানে বা বাঁ-দিকে তীব্র ব্যথা, ভারী ভাব বা মোচড়ানোর মতো অনুভূতি হওয়া।
- ব্যথা ছড়িয়ে পড়া: এই ব্যথা কেবল বুকেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বাঁ হাত, কাঁধ, পিঠ, গলা কিংবা চোয়ালে ছড়াতে পারে।
- শ্বাসকষ্ট ও ঘাম: বুকে ব্যথার সাথে সাথে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া এবং শরীর ঠান্ডা হয়ে অস্বাভাবিকভাবে ঘেমে যাওয়া।
- বমি ও ক্লান্তি: বমি বমি ভাব, সরাসরি বমি হওয়া এবং কোনো কারণ ছাড়াই শরীর অবশ বা অত্যন্ত ক্লান্ত লাগা।
- স্থায়িত্ব: এই ব্যথা সাধারণত ৫ থেকে ১৫ মিনিট বা তার চেয়েও বেশি সময় স্থায়ী হয় এবং বিশ্রামে থাকলেও কমে না।
স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণসমূহ:
- মুখের পরিবর্তন: হঠাৎ করে মুখের এক পাশ বা ঠোঁটের কোণ বেঁকে যাওয়া (রোগীকে হাসতে বললে একদিক ঝুলে থাকে)।
- হাতের দুর্বলতা: হঠাৎ শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া, এক হাত তুলতে না পারা বা অবশ লাগা।
- কথা জড়িয়ে যাওয়া: কথা বলতে সমস্যা হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অন্যের স্পষ্ট কথাও বুঝতে না পারা।
- দৃষ্টিশক্তি ও ভারসাম্য হ্রাস: হঠাৎ করে চোখে ঝাপসা দেখা বা এক চোখে একেবারেই দেখতে না পাওয়া। সেই সাথে মাথা ঘোরা এবং শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
- তীব্র মাথাব্যথা: কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই হঠাৎ তীব্র ও অসহ্য মাথাব্যথা শুরু হওয়া।
চিকিৎসার ‘সোনালি সময়’ বা গোল্ডেন আওয়ার
হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক—উভয় ক্ষেত্রেই চিকিৎসার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, যে সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছালে রোগী স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর প্রথম ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হার্টের পেশির ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। অন্যদিকে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা একে ‘সোনালি সময়’ বা গোল্ডেন আওয়ার বলেন, যা মাত্র ৩ থেকে ৪.৫ ঘণ্টা। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যে রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে সঠিক থেরাপি বা ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব হলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা প্যারালাইসিস হওয়া থেকে বাঁচানো যায়। তাই লক্ষণ দেখা মাত্র এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে রোগীকে নিকটস্থ জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে।
















