বছরের শুরুতেই দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গে ছয় শতাধিক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এবার তীব্র মরণছোবল বসাতে শুরু করেছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে একজন রাজধানী ঢাকায় এবং অন্যজন বরিশাল বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আজ রবিবার (২১ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশে সর্বমোট ৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে চলমান জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই মারা গেছেন চারজন। এর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল অধিদপ্তর। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে বরাবরের মতোই সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ৯৩ জন। এছাড়া ঢাকার বাইরে বরিশাল বিভাগে ৫৪ জন, খুলনায় ৫২ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৯০০ জনের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জুনের প্রথম ২০ দিনেই বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মাসেই এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর আগে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী গতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরম ভাবিয়ে তুলছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি মাসের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার দুই উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এডিস মশা নিধন ও সচেতনতায় জোর দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি গত ৭ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে পুরো জাতির জন্য এক বড় পরীক্ষা উল্লেখ করে বলেছিলেন, “ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাধারণ রোগ নয়; এটি আমাদের জন্য একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই মহামারি সংকট মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের একার দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে।” তিনি মশা নিধনকে এক কঠিন লড়াই আখ্যা দিয়ে আরও যোগ করেন, “আমি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ দিতে পারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করতে বলতে পারি। কিন্তু শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা আদো সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে এবং যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই ঘরে ঘরে সচেতনতা ছাড়া এই লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব।”
















