সংগৃহীত ছবি
আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যভাসের কারণে শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তায় থাকেন না, এমন মানুষ এখন মেলা ভার। রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া মানেই হৃদরোগ বা আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ তৈরি হওয়া। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সব কোলেস্টেরল কিন্তু শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। শরীরে মূলত ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের কোলেস্টেরলই থাকে। এর মধ্যে ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল (HDL) শরীরের হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে এবং ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ক্ষতিকর বা খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত এলডিএল (LDL) হার্টের ধমনীতে স্তূপ আকারে জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সাধারণত শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়লে চিকিৎসকেরা ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় বদল ও ডায়েটের ওপর জোর দিতে বলেন। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— কোলেস্টেরল যদি মাঝারি মাত্রায় বাড়ে, তবে কি ওষুধ ছাড়া শুধু খাদ্যতালিকায় বদল এনেই তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খারাপ কোলেস্টেরল বশে রাখতে ডায়েটের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওষুধ পুরোপুরি বাদ দিয়ে কেবল খাওয়া-দাওয়া বদলে এটি সব সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না-ও হতে পারে। বরং সঠিক ওষুধ, সুষম ডায়েট ও নিয়মিত শরীরচর্চার সম্মিলিত প্রয়াসই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হার্ট ভালো রাখে।
ভারতের বেঙ্গালুরুর খ্যাতনামা পুষ্টিবিদ পূজা এইচএন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “কারও কোলেস্টেরল যদি মাঝারি মাত্রায় বেড়ে থাকে এবং তিনি যদি টানা কয়েক মাস সঠিকভাবে নিয়মতান্ত্রিক খাদ্যতালিকা মেনে চলেন, তবে অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই তা নিয়ন্ত্রণে আসে। এর জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় উচ্চ ফাইবার (আঁশযুক্ত খাবার), লিন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখতে হবে।” তৈলাক্ত মাছ, ওটস, ফলমূল, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো ও ফাইবারযুক্ত খাবার শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে ম্যাজিকের মতো সাহায্য করে বলেও জানান তিনি। তবে এই পুষ্টিবিদ মনে করিয়ে দেন, সব ডায়েট সবার শরীরের ওপর সমানভাবে কাজ করে না। কোনো ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, ওজন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের (জিনেটিক্স) ওপর ডায়েটের কার্যকারিতা নির্ভর করে।
কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূলত পাঁচটি প্রধান বিষয়ে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা:
১. হৃদবান্ধব খাদ্যতালিকা: খাবারে দ্রবণীয় ফাইবার, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (যেমন—অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, সাদা তিল, বাদাম), টাটকা শাকসবজি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল রাখতে হবে। সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে ট্রান্সফ্যাট, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত প্রসেসড খাবার।
২. নিয়মিত শরীরচর্চা: প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা অ্যারোবিক্স করার অভ্যাস হার্ট ভালো রাখার পাশাপাশি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়।
৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের বাড়তি মেদ ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাই হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে বিএমআই (BMI) অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
৪. মদ্যপান পরিহার: অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড ও খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
৫. ধূমপান বর্জন: ধূমপানের কারণে ধমনীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের (এইচডিএল) মাত্রা দ্রুত কমে যায়। তাই হার্ট ভালো রাখতে ধূমপান ছাড়তেই হবে।
চিকিৎসকদের চূড়ান্ত পরামর্শ, কোলেস্টেরলের সমস্যা দেখা দিলে ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট দেখে নিজে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ রোগীর সার্বিক শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করে একমাত্র চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন যে পরিস্থিতি কেবল ডায়েটেই সামাল দেওয়া যাবে, নাকি তাৎক্ষণিক ওষুধের প্রয়োজন আছে।

অনলাইন ডেস্ক 














