ঢাকা , রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রণাঙ্গন থেকে শরণার্থী শিবির; হাহাকার আর প্রতীক্ষার এক বিষণ্ণ উৎসব

কেমন ছিল, ১৯৭১ সালের ঈদুল ফিতর

সংগৃহীত ছবি

 

 

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে প্রধান আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর পঞ্জিকার পাতায় ঈদ এলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না কোনো উৎসবের আমেজ। পাকিস্তানি বাহিনীর আট মাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিকাণ্ড আর লুণ্ঠনের ফলে সারা দেশ তখন এক মৃত্যুপুরী।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক বাশার খানের ভাষায়, ‘এমন বিবর্ণ, নিরানন্দ ও বেদনা-বিধুর ঈদ বাঙালির জীবনে আর কখনোই আসেনি।’ অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে শুরু করে রণাঙ্গন কিংবা ভারতের শরণার্থী শিবির—সবখানেই ঈদ এসেছিল এক ভিন্ন রূপে, যেখানে আনন্দের চেয়ে বিষাদই ছিল মুখ্য।

 

 

অবরুদ্ধ ঢাকা: গোলার শব্দে ভাঙা ঘুম

একাত্তরের সেই ঈদের সকালে ঢাকার আকাশ পরিষ্কার হওয়ার আগেই নগরবাসীর ঘুম ভেঙেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কামানের গোলার শব্দে। শহরজুড়ে ছিল সেনাদের কড়া টহল আর অঘোষিত কারফিউর আতঙ্ক। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে জানা যায়, সাধারণ মানুষের মনে এতটাই ত্রাস ছিল যে, অনেকেই ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সাহস পাননি। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় তিনি সেমাই-জর্দা রান্না করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তা উৎসবের জন্য নয়; বরং যদি কোনো গেরিলা যোদ্ধা বা তাঁর ছেলে রুমীর কোনো সহযোদ্ধা ক্ষুধার্ত অবস্থায় আশ্রয় নিতে আসে, তাদের মুখে তুলে দেওয়ার জন্য। ঢাকা তখন এক নীরব কান্নার শহর, যেখানে আতরদানির বদলে ছিল বারুদের গন্ধ।

 

রণাঙ্গনের ঈদ: পাহারায় হিন্দু সহযোদ্ধা, নামাজে মুসলিমরা

মুক্তিকামী মানুষের জন্য রণাঙ্গন ছিল ত্যাগের ক্ষেত্র। সেখানে ঈদের দিনও থেমে ছিল না লড়াই। কুড়িগ্রাম, শেরপুর, কুষ্টিয়া ও আখাউড়ায় সেদিনও সম্মুখযুদ্ধ চলেছে। তবে যুদ্ধের মাঝেই অনেক ক্যাম্পে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁদের হিন্দু সহযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে চারপাশ পাহারায় ছিলেন, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত হামলা করতে না পারে। কোনো কোনো ক্যাম্পে সারা দিনের যুদ্ধের পর রাতে যখন এক টুকরো খাসির মাংস পাতে পড়ল, তখন মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারলেন আজ ঈদ। প্রিয়জনদের কথা মনে করে অনেকের চোখেই তখন অশ্রু নেমেছিল।

 

 

প্রবাসী সরকার ও শরণার্থী শিবির: শূন্য থালা আর অটল সংকল্প

কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের কাছেও ঈদ ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেদিন কোনো বিশেষ খাবার স্পর্শ করেননি, এমনকি নতুন কাপড়ও পরেননি। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আগরতলায় ঈদের নামাজ শেষে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন— ‘আমরা আগামী ঈদ করবো স্বাধীন বাংলাদেশে’। অন্যদিকে, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য ঈদ ছিল কেবলই বেঁচে থাকার লড়াই। ত্রাণের জন্য দীর্ঘ লাইন আর শিশুদের ক্ষুধার্ত মুখগুলো উৎসবের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছিল। সেখানে সেমাই বা পোলাওয়ের বদলে ছিল আশ্রিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

 

 

আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের সেই ২০ নভেম্বরের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত রক্ত আর কান্নার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের আজকের এই উৎসবের স্বাধীনতা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রণাঙ্গন থেকে শরণার্থী শিবির; হাহাকার আর প্রতীক্ষার এক বিষণ্ণ উৎসব

কেমন ছিল, ১৯৭১ সালের ঈদুল ফিতর

Update Time : ০৮:৫৫:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

 

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে প্রধান আনন্দোৎসব ঈদুল ফিতর। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর পঞ্জিকার পাতায় ঈদ এলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না কোনো উৎসবের আমেজ। পাকিস্তানি বাহিনীর আট মাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিকাণ্ড আর লুণ্ঠনের ফলে সারা দেশ তখন এক মৃত্যুপুরী।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক বাশার খানের ভাষায়, ‘এমন বিবর্ণ, নিরানন্দ ও বেদনা-বিধুর ঈদ বাঙালির জীবনে আর কখনোই আসেনি।’ অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে শুরু করে রণাঙ্গন কিংবা ভারতের শরণার্থী শিবির—সবখানেই ঈদ এসেছিল এক ভিন্ন রূপে, যেখানে আনন্দের চেয়ে বিষাদই ছিল মুখ্য।

 

 

অবরুদ্ধ ঢাকা: গোলার শব্দে ভাঙা ঘুম

একাত্তরের সেই ঈদের সকালে ঢাকার আকাশ পরিষ্কার হওয়ার আগেই নগরবাসীর ঘুম ভেঙেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কামানের গোলার শব্দে। শহরজুড়ে ছিল সেনাদের কড়া টহল আর অঘোষিত কারফিউর আতঙ্ক। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে জানা যায়, সাধারণ মানুষের মনে এতটাই ত্রাস ছিল যে, অনেকেই ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সাহস পাননি। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় তিনি সেমাই-জর্দা রান্না করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তা উৎসবের জন্য নয়; বরং যদি কোনো গেরিলা যোদ্ধা বা তাঁর ছেলে রুমীর কোনো সহযোদ্ধা ক্ষুধার্ত অবস্থায় আশ্রয় নিতে আসে, তাদের মুখে তুলে দেওয়ার জন্য। ঢাকা তখন এক নীরব কান্নার শহর, যেখানে আতরদানির বদলে ছিল বারুদের গন্ধ।

 

রণাঙ্গনের ঈদ: পাহারায় হিন্দু সহযোদ্ধা, নামাজে মুসলিমরা

মুক্তিকামী মানুষের জন্য রণাঙ্গন ছিল ত্যাগের ক্ষেত্র। সেখানে ঈদের দিনও থেমে ছিল না লড়াই। কুড়িগ্রাম, শেরপুর, কুষ্টিয়া ও আখাউড়ায় সেদিনও সম্মুখযুদ্ধ চলেছে। তবে যুদ্ধের মাঝেই অনেক ক্যাম্পে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁদের হিন্দু সহযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে চারপাশ পাহারায় ছিলেন, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত হামলা করতে না পারে। কোনো কোনো ক্যাম্পে সারা দিনের যুদ্ধের পর রাতে যখন এক টুকরো খাসির মাংস পাতে পড়ল, তখন মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারলেন আজ ঈদ। প্রিয়জনদের কথা মনে করে অনেকের চোখেই তখন অশ্রু নেমেছিল।

 

 

প্রবাসী সরকার ও শরণার্থী শিবির: শূন্য থালা আর অটল সংকল্প

কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের কাছেও ঈদ ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেদিন কোনো বিশেষ খাবার স্পর্শ করেননি, এমনকি নতুন কাপড়ও পরেননি। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আগরতলায় ঈদের নামাজ শেষে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন— ‘আমরা আগামী ঈদ করবো স্বাধীন বাংলাদেশে’। অন্যদিকে, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য ঈদ ছিল কেবলই বেঁচে থাকার লড়াই। ত্রাণের জন্য দীর্ঘ লাইন আর শিশুদের ক্ষুধার্ত মুখগুলো উৎসবের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছিল। সেখানে সেমাই বা পোলাওয়ের বদলে ছিল আশ্রিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

 

 

আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের সেই ২০ নভেম্বরের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত রক্ত আর কান্নার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের আজকের এই উৎসবের স্বাধীনতা।