সংগৃহীত ছবি
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর এক অবিস্মরণীয় ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী। ভয়াবহ কম্পনে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের শত শত টন ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘ আট দিন অর্থাৎ প্রায় ১৯২ ঘণ্টা অলৌকিকভাবে আটকে থাকার পর এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ওই ভাগ্যবানের নাম এরনান গিল। প্রায় ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তার নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করার পর, গতকাল বুধবার রাতে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মীরা তাকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে সক্ষম হন। ধসে পড়া ভবনের প্রায় ১৪০ টন ওজনের কংক্রিটের বিশাল ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছিলেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে উদ্ধারকর্মীদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি (BBC) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যন্ত জটিল এই উদ্ধার অভিযানে বিভিন্ন দেশের শত শত প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী অংশ নেন। এর আগে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক চিলিয়ান অগ্নিনির্বাপক কর্মী চলমান এই প্রক্রিয়াকে “ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন উদ্ধার অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। উল্লেখ্য, গত ২৪ জুনের ওই প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে গিলের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই ভেনেজুয়েলা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ উদ্ধারকারী দলগুলো (USAR) যৌথভাবে তাকে উদ্ধারে কোমর বেঁধে নামে। তবে উদ্ধারকাজের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল, কংক্রিট সরানোর সময় তৈরি হওয়া সুড়ঙ্গটি বারবার ধসে পড়ছিল, যা উদ্ধারকারী ও আটকে পড়া ব্যক্তি উভয়ের জন্যই চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সব বাধা পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা বুধবার রাতে গিলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। সেখানে একটি বিশেষ সরু ‘স্নেক ক্যামেরা’ পাঠিয়ে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয় এবং সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে তাকে প্রাথমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় লাইফ-সাপোর্ট সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
কোস্টারিকান রেড ক্রসের একজন সিনিয়র সদস্য জানান, অলৌকিকভাবে গিলের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে বেশ স্থিতিশীল। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়েই তাকে প্রথমে পানি সরবরাহ করা হয়েছে এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে শিরায় তরল (IV Fluid) দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভবন ধসে পড়ার ঠিক ওই মুহূর্তে গিল একটি ছোট ও মজবুত কংক্রিট বুথের ভেতরে অবস্থান করছিলেন, যা তাকে চারপাশের প্রায় ১৪০ টন ওজনের ভারী ধ্বংসস্তূপের সরাসরি আঘাত থেকে আংশিকভাবে রক্ষা করে। আর এ কারণেই তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা তাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়, স্থিতিশীল এবং হাসিখুশি অবস্থায় উদ্ধার করেছেন। দীর্ঘ আট দিন অন্ধকার মৃত্যুর কূপে খাবার ও পানিহীন আটকে থেকেও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে অনবরত কথা বলেছেন এবং সুড়ঙ্গ খুঁড়তে তাদের উল্টো উৎসাহ যুগিয়েছেন, যা উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়েছে। বর্তমানে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি।















