ছবি : খালেদ সরকার
ধূসর একটি চাদরে মোড়ানো তিন বছরের এক নিথর শিশু। তাকে বুকে চেপে মহাখালীর ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলছেন এক যুবক। গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ছবিটি দেখে চোখের জল ফেলেছেন হাজারো মানুষ। প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকারের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই মুহূর্তটি নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা জল্পনা। অবশেষে সেই করুণ ছবির পেছনের প্রকৃত সত্য ও পরিচয় সামনে এনেছে বিবিসি বাংলা।
পরিচয় ও প্রেক্ষাপট ছবিতে দেখা যাওয়া শিশুটির নাম মো. সাদমান। সে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মো. সজীব ও আফরিন মীম দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল। টানা ১০ দিন যমে-মানুষে লড়াই করার পর গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই ছবিটি শেয়ার করে লিখেছিলেন, ‘সন্তানের লাশ নিয়ে এক অভাগা পিতা’। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিশুটিকে কোলে নিয়ে ছুটে চলা ওই যুবক সাদমানের বাবা নন, বরং তার আত্মীয় রেদোয়ান আহমেদ রাফি। রাফি সাদমানের মায়ের খালাতো বোনের জামাতা।
হাসপাতালের সেই মুহূর্ত সাদমানের বাবা সজীব ছেলের মৃত্যুতে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত শিশুটির মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য সিএনজি খুঁজতে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসেন রাফি। সেই মুহূর্তটিই ধরা পড়ে আলোকচিত্রীর ক্যামেরায়। সজীব স্মৃতিচারণা করে বলেন, “আমি যখন হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাই, তখনও বুঝতে পারিনি আমার সাদমান আর নেই।” নেটিজেনদের কেউ কেউ অ্যাম্বুল্যান্স না পাওয়ার অভিযোগ তুললেও পরিবার জানায়, শোকের সেই মুহূর্তে দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর তাগিদে তারা নিজেরাই সিএনজি বেছে নিয়েছিলেন।
হামের ভয়াবহতা সাদমানের এই অকাল মৃত্যু বাংলাদেশে বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের এক করুণ স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১২ এপ্রিল প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়েছিল। পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে ১৬ এপ্রিল তাকে মহাখালীর হাম ডেডিকেটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রবিবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
বর্তমানে দেশে হাম ও এই জাতীয় উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিএনসিসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে আজিমপুর গোরস্তানে যখন একমাত্র সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন সজীব-আফরিন দম্পতি, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ছবিটি হয়ে উঠেছে এক জাতীয় শোকের প্রতীক।















