ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জোর প্রস্তুতি

এমন কোনো কুকীর্তি নেই, যেটা বেনজীর আহমেদ করেননি : চিফ প্রসিকিউটর

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। সংগৃহীত ছবি

 

দুর্নীতি মামলায় সুদূর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেপ্তারের পর এবার নতুন আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। বিতর্কিত এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন।

 

 

 

চিফ প্রসিকিউটর তাঁর ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেন কোনো রাষ্ট্রীয় দুষ্কর্ম ও অপরাধ নেই, যা বেনজীর আহমেদ তাঁর কর্মজীবনে করেননি। এক যুগ আগে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব ও ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ। শুধু শাপলা চত্বরই নয়, ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কাউন্সিলর একরামুল হককে নির্মমভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার পেছনেও এই কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। একরামুল হকের মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর শিশুকন্যার সঙ্গে মোবাইল ফোনের শেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে বেনজীর কোনোভাবেই এই সুপরিকল্পিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর দায় এড়াতে পারেন না।

 

 

 

আওয়ামী লীগ বা পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দিকে ইঙ্গিত করে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আওয়ামী শাসনের শেষ সময়ে তাদেরই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে কোনো এক প্রভাবশালী কুশীলব বেনজীরের এই চরম কুকীর্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন।” এ সময় চিফ প্রসিকিউটর ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’-এর কিছু অংশ সাংবাদিকদের পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ওই প্রতিবেদনের পরই দেশবাসী প্রথম জানতে পারে যে দেশের সেবক পরিচয় দিয়ে বেনজীর, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ জমি গড়ে তুলেছেন। দেশের ইতিহাসে বিগত সবকটি বিতর্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনগুলোতে দেশের গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে তিনি ফ্যাসিবাদের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।

 

 

 

সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) নেই, তবে আমাদের অত্যন্ত সুদৃঢ় দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বেনজীরের বিরুদ্ধে থাকা সবকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁকে দ্রুত ফেরত দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।” তিনি স্পষ্ট করেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা মাত্রই ট্রাইব্যুনালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

 

 

 

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গত রবিবার (১৪ জুন) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে সে দেশের পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে গত ১২ জুন ইউএই-এর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ আবুধাবি থেকে একটি জরুরি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে এই সফল গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবহিত করে। বর্তমানে তিনি দুবাই পুলিশের কঠোর হেফাজতে রয়েছেন এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে।

 

 

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জোর প্রস্তুতি

এমন কোনো কুকীর্তি নেই, যেটা বেনজীর আহমেদ করেননি : চিফ প্রসিকিউটর

Update Time : ১১:৩৩:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। সংগৃহীত ছবি

 

দুর্নীতি মামলায় সুদূর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেপ্তারের পর এবার নতুন আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। বিতর্কিত এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন।

 

 

 

চিফ প্রসিকিউটর তাঁর ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেন কোনো রাষ্ট্রীয় দুষ্কর্ম ও অপরাধ নেই, যা বেনজীর আহমেদ তাঁর কর্মজীবনে করেননি। এক যুগ আগে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব ও ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ। শুধু শাপলা চত্বরই নয়, ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কাউন্সিলর একরামুল হককে নির্মমভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার পেছনেও এই কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। একরামুল হকের মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর শিশুকন্যার সঙ্গে মোবাইল ফোনের শেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে বেনজীর কোনোভাবেই এই সুপরিকল্পিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর দায় এড়াতে পারেন না।

 

 

 

আওয়ামী লীগ বা পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দিকে ইঙ্গিত করে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আওয়ামী শাসনের শেষ সময়ে তাদেরই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে কোনো এক প্রভাবশালী কুশীলব বেনজীরের এই চরম কুকীর্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন।” এ সময় চিফ প্রসিকিউটর ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’-এর কিছু অংশ সাংবাদিকদের পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ওই প্রতিবেদনের পরই দেশবাসী প্রথম জানতে পারে যে দেশের সেবক পরিচয় দিয়ে বেনজীর, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ জমি গড়ে তুলেছেন। দেশের ইতিহাসে বিগত সবকটি বিতর্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনগুলোতে দেশের গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে তিনি ফ্যাসিবাদের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।

 

 

 

সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) নেই, তবে আমাদের অত্যন্ত সুদৃঢ় দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বেনজীরের বিরুদ্ধে থাকা সবকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁকে দ্রুত ফেরত দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।” তিনি স্পষ্ট করেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা মাত্রই ট্রাইব্যুনালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

 

 

 

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গত রবিবার (১৪ জুন) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে সে দেশের পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে গত ১২ জুন ইউএই-এর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ আবুধাবি থেকে একটি জরুরি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে এই সফল গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবহিত করে। বর্তমানে তিনি দুবাই পুলিশের কঠোর হেফাজতে রয়েছেন এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে।