সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ ১৩ মাসের বন্দিজীবন ও নানা আইনি জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের প্রিয় বাসভবনে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক বহুল আলোচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে তার এই কারামুক্তির পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের তীব্র কৌতুহলের পাশাপাশি এখন নতুন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দেওভোগে অবস্থিত তার পৈতৃক বাসভবন ‘চুনকা কুটির’। মেয়রের ফেরার খবর পেয়ে যেমন চুনকা কুটিরের সামনে উৎসুক কর্মী-সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে, ঠিক তেমনই ড. আইভীর নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার বাসার আশপাশে আধুনিক সিসিটিভি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরা স্থাপন করেছে জেলা পুলিশ।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল ১১টার পর নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকার চুনকা কুটিরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব ও কড়া নিরাপত্তার দৃশ্য। এর আগে গতকাল বুধবার (৩ জুন) রাত সোয়া ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান আইভী। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গভীর রাতে (সাড়ে ১২টার দিকে) তিনি নিজ বাসভবনে পৌঁছান। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর পরপরই মধ্যরাতে চুনকা কুটিরের মূল ফটক, সংলগ্ন রাস্তা এবং আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্টে তড়িঘড়ি করে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে শুরু করে পুলিশ।
হঠাৎ এই সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, এটি মূলত তাদের চলমান একটি মহৎ পরিকল্পনার অংশ। পুরো নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকাকে সিসিটিভির আওতায় আনার অংশ হিসেবে শহরে প্রায় ২০০০ আধুনিক ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। তবে বিশেষভাবে ডা. আইভী জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের নিষিদ্ধ বা উগ্রবাদী সংগঠনের কর্মীরা যাতে এই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এখানে এসে সংগঠিত হতে না পারে, সেই স্পর্শকাতর বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রাখতেই এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আইভীর পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ বন্দিজীবনের ধকল এবং বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আপাতত বাসায় আগত দর্শনার্থীদের সংখ্যা সীমিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কড়া পাহারা ও কড়াকড়ির মাঝেও দূর-দূরান্ত থেকে আসা শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তদের আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আইভীর স্বজন ও তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল কাদির এবং সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিরকে সারাদিন তার পাশেই অবস্থান করতে দেখা যায়।
কারাগারের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তারা জানান, দীর্ঘ ১৩ মাস কারাগারে থাকাকালীন ডা. আইভী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শান্ত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও দুরুদ শরিফ পাঠসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশীলনে মগ্ন থাকতেন। বন্দিত্বের এই কঠিন সময়টিকে তিনি মূলত গভীর আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর সে কারণেই কারামুক্তির প্রথম দিনটিতে তার মধ্যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিকল্পনা নিয়ে কোনো তৎপরতা বা ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং দীর্ঘ বন্দিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা, আত্মসমালোচনা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নীরব ভালোবাসার জবাব দিয়েই কাটছে দেশের এই জনপ্রিয় নারী নেত্রীর বর্তমান সময়।
প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের মেয়রের পদ থেকে অপসারিত হন আইভী। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে দেওভোগের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। একের পর এক মামলায় জামিন পেলেও ‘নেনো কেস’ বা নতুন মামলায় বারবার গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে তার মুক্তি বিলম্বিত হয়। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন লাভের পর অবসান ঘটে তার দীর্ঘ কারাগারের দিনগুলোর। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সফল চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে নবগঠিত নাসিকের টানা তিনবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 













