গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ছবি: বিবিসি
দেশে শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য ও পাশবিক অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ঘটে যাওয়া এমন লোমহর্ষক ঘটনা দেশের শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক নৈতিকতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মানবাধিকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসেই সারা দেশে অন্তত ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিগত দুই সপ্তাহেই ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা দেশের প্রচলিত শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর পরিসংখ্যান থেকে দেশে শিশু নির্যাতনের এই হাড়হিম করা চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া আরও অন্তত ৪৬টি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। একই সময়ে কেবল পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭টি নিষ্পাপ শিশুকে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি ঘটনাই একেকটি শৈশবের নির্মম অবসান, একটি করে পরিবারের আজীবন সহ্য করার মতো অসহনীয় ট্র্যাজেডি এবং সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন প্রতিফলন।
অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ। তবে বাস্তবতার সঙ্গে এই আইনি সুরক্ষার ব্যবধান দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে।
অপরাধী ও ধর্ষকদের মানসিক বিকারগ্রস্ততার বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, “উন্নত দেশগুলোতে যাদের এই ধরনের বিকৃত মানসিকতা থাকে, তাদেরকে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটা হয় না, যার ফলে শিশুরা একটি অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে।” সমাজে অপরাধের স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দেশে মৃত্যুটা খুব সহজ হয়ে গেছে—যেন এটা কোনো ব্যাপারই না। এই ‘কোনো ব্যাপার না’ মানসিকতাটা অপরাধপ্রবণ মানুষের জন্য অপরাধ করা আরও সহজ করে দিচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্ষকদের সামাজিকভাবেও চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষায় একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘পৃথক কমিশন’ গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান এই প্রসঙ্গে বলেন, “যদি একটি চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন বা শিশু সুরক্ষা কমিশন গঠন করা হয়, যারা শুধুমাত্র শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা করবে, তবে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সাথে যারা শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করছে তাদের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকতে হবে।” রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করে তিনি আরও বলেন, “এই বিষয়গুলোকে আমাদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই সঠিক গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই।”
উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের একটি চাইল্ড রাইটস ম্যানিফেস্টোতে (শিশু অধিকার ইশতেহার) স্বাক্ষর করেছিল দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন অদৃশ্য। খন্দকার ফারজানা রহমান এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিয়মিত কার্যক্রমে এবং তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষাকে কতটুকু ধারণ করে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।” বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা, সুস্পষ্ট দায়বদ্ধতা ও সমাজের নৈতিক প্রতিরোধ ছাড়া এই অন্ধকার থেকে মুক্তির কোনো বিকল্প পথ নেই।

অনলাইন ডেস্ক 














