ছবি : সংগৃহীত
দেড় দশকের দীর্ঘ গণতন্ত্রহীনতা, বিতর্কিত নির্বাচন এবং অকার্যকর সংসদের অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে আগামীকাল বুধবার বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের পর গঠিত এই সংসদকে কেন্দ্র করে দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশ ও জাতির সংকটের সমাধান কি এবার রাজপথের পরিবর্তে সংসদেই মিলবে? নাকি দাবি আদায়ে দলগুলোকে আবারও উত্তপ্ত রাজপথেই ফিরে যেতে হবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর উত্তর নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা এবং আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মানসিকতার ওপর।
বিগত ২০০৮ সাল পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের ফলে সংসদ তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল। সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি বা নামমাত্র বিরোধী দলের কারণে সংসদীয় চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। তবে এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা এবং সংসদে থাকা দলগুলো প্রত্যেকেই ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের শরিক। ফলে সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ১৯৯১–৯৬ কিংবা ২০০১–০৬ মেয়াদে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে রাজপথকেই বিধ্বংসী আন্দোলনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এবার সেই ধারার পরিবর্তন চায় রাজনৈতিক দলগুলো।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সমস্যার সমাধান সংসদেই খোঁজার চেষ্টা করবে। তবে ‘জুলাই সনদ’ বা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রশ্নে একমত হতে না পারলে রাজপথকেও বিকল্প হিসেবে রাখছে তারা। দলটির নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “আমরা দাবি আদায়ে জনমত গড়ে তুলবো, জনসভা করবো। তবে সংসদকে কার্যকর করতে আমরা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চাই। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন না হলে জনগণকে সংগঠিত করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।” অন্যদিকে, সরকারি দল বিএনপি প্রত্যাশা করছে যে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিরোধী দল দায়িত্বশীল হবে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন মনে করেন, জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কার নিয়ে যেকোনো জটিলতা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। সংসদই হবে সকল সাংবিধানিক দিক–নির্দেশনার প্রাণকেন্দ্র।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ প্রাণবন্ত হওয়া নির্ভর করছে সরকারি দলের সদিচ্ছার ওপর। বিশ্লেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, “যদি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিরোধী দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তবেই সংসদ কার্যকর হবে। অন্যথায় বিরোধী দলকে বর্জন করা হলে তারা আন্দোলনের জন্য আবারও রাজপথেই ফিরে যাবে।” দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ যদি প্রকৃত অর্থেই কার্যকর হয়, তবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র স্থায়ী রূপ পাবে এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত সার্থক হবে– এমনটিই মনে করছেন সচেতন দেশবাসী।

রাজনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা 













