কড়াইল বস্তিতে উদ্বোধন হবে প্রধানমন্ত্রীর ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি। ছবি : সংগৃহীত
দেশের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কেবল নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ আর্থিক সহায়তা পাবে। আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন দিগন্তের কথা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটি আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা সবসময়ই বলেছি, উন্নয়নের সুফল প্রতিটি মানুষের ঘরের দুয়ারে পৌঁছাতে হবে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এই ধরনের সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্ত, যা আমরা বাস্তবায়ন করছি।” তিনি দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেন যে, সুবিধাভোগী নির্বাচনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয়করণ করা হয়নি। সম্পূর্ণ আধুনিক সফটওয়্যার ও নিরপেক্ষ যাচাই–বাছাইয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাইলটিং বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি খানার (পরিবার) তথ্য সংগ্রহে জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সরেজমিনে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান যাচাই করেছেন। সংগৃহীত তথ্যগুলো ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা দারিদ্র্য সূচক মান নির্ণয়কারী স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও ডাবল ডিপিং (একাধিক ভাতা গ্রহণ) এবং সরকারি চাকরি বা পেনশনের তথ্য যাচাই শেষে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই ভাতার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
কার্ডের বিশেষত্ব ও বণ্টন প্রক্রিয়া: নির্বাচিত প্রত্যেক নারী গৃহপ্রধান একটি করে আধুনিক ‘স্পর্শবিহীন’ কার্ড পাবেন। এতে উন্নত চিপ, কিউআর কোড এবং এনএফসি (নেয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা কার্ডটিকে জালিয়াতিমুক্ত রাখবে। সাধারণত ৫ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য একটি কার্ড বরাদ্দ থাকবে। জি–টু–পি (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতিতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ভাতার টাকা সরাসরি নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫০০ টাকা নগদ দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
বরাদ্দ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: পাইলটিং পর্যায়ের জন্য আগামী জুন মাস পর্যন্ত ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছাবে। বাকি অর্থ অনলাইন সিস্টেম উন্নয়ন এবং কার্ড প্রস্তুতকরণে ব্যয় হচ্ছে। পুরো প্রকল্পটি সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন জানান, এই পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সকল যোগ্য নারীপ্রধান পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা 













