ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সোমবার (৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের এই দর ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিশ্বের বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাজার এখন পুরোপুরি অস্থিতিশীল।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম এক লাফে ১৪ শতাংশ বেড়ে ১০৫.৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সেশনের এক পর্যায়ে ১১৯.৫০ ডলারে উঠেছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯.৪৮ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই–এর দাম ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা একে ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ বা তীব্র সরবরাহ সংকটের লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করছেন। বর্তমান এবং ছয় মাস পরের সরবরাহের মূল্যের ব্যবধান রেকর্ড ৩৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটকেও হার মানিয়েছে।
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা। বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাস। বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো তাদের দুটি প্রধান তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় খনিগুলো থেকে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৭০ শতাংশ। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং বাহরাইনের বিএপিসিও ইতিমধ্যে ‘ফোর্স ম্যাজেউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতিতে চুক্তি পালনে অক্ষমতা ঘোষণা করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শিল্পাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সরবরাহ চেইন আরও ভেঙে পড়েছে।
গ্যাসের বাজারেও বইছে অস্থিরতার হাওয়া। বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষও হয়, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও লজিস্টিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আরও কয়েক মাস চড়া জ্বালানি মূল্যের বোঝা বইতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় সীমিত রাখার আশ্বাস দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি ৩.২২ ডলারে উঠে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জি–৭ রাষ্ট্রগুলো এবং মার্কিন সিনেট কৌশলগত মজুদ (Strategic Reserves) ব্যবহারের আলোচনা শুরু করলেও বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে সেই মজুদ হবে সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের মতো।
সূত্র: রয়টার্স।

অর্থনীতি প্রতিবেদক 













