ঢাকা , রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আভাসে উত্তাল জ্বালানি বাজার; এশিয়ায় সরবরাহ নিশ্চিতের তোড়জোড়

বিশ্ববাজারে ভাসমান ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল: আমদানিতে মুখিয়ে ভারত-চীন

সংগৃহীত ছবি

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের দামামার মাঝে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে ইরান। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যেই জানা গেছে, সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে জাহাজে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড)। ওয়াশিংটন কর্তৃক তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ার আভাস পাওয়ায় এখন এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

 

 

বিশ্বখ্যাত জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের সিনিয়র ম্যানেজার ইমানুয়েল বেলোস্ট্রিনো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে চীনের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বিভিন্ন জাহাজে বর্তমানে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বা ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল মজুত রয়েছে। তবে ভিন্ন মত দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এসপেক্ট। তাদের ১৯ মার্চের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই মজুতের পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল। যদিও এই পরিমাণটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উৎপাদন ঘাটতির তুলনায় মাত্র ১৪ দিনের সরবরাহের সমান, তবুও অস্থিতিশীল বাজারে এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

 

 

এশীয় শোধনাগারে হাহাকার ও হরমুজ সংকট

এশিয়া মহাদেশের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিপাকে পড়েছে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় অনেক দেশ ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এই সংকটের মুহূর্তে ইরানের এই ভাসমান তেলের মজুত এশীয় দেশগুলোর জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।

 

 

ইরানি তেলের প্রধান গন্তব্য যেখানে

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে চীনই ছিল ইরানি তেলের প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য ক্রেতা। কেপলারের তথ্যমতে, গত বছর চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল কিনেছে। চীনের পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো একসময় ইরানের বড় আমদানিকারক ছিল।

বর্তমানে ভারতের শোধনাগারগুলো পুনরায় ইরানি তেল সংগ্রহের ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ দেখাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভারত সরকার এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধের শর্তাবলী নিয়ে স্বচ্ছতা পাওয়া গেলেই তারা আমদানির চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভারত যেভাবে রুশ তেল সংগ্রহ করেছিল, ঠিক সেভাবেই এখন ইরানের দিকে ঝুঁকছে দিল্লি।

 

 

জটিলতা ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’ চ্যালেঞ্জ

তবে এই তেল বাজারে আসা মোটেও সহজ নয়। আমদানিকারকদের জন্য প্রধান বাধা হলো অর্থ প্রদানের পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। এছাড়া সমুদ্রে থাকা তেলের একটি বড় অংশ তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজে পরিবহন করা হচ্ছে, যা বীমা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে। ২০১৮ সালের পর থেকে ইরানের সরাসরি তেল বিক্রির পথ সংকুচিত হওয়ায় বর্তমানে বড় একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেনাবেচা হচ্ছে, যা বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

পরিশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির সময়ে ১৭ কোটি ব্যারেল তেলের এই বিশাল মজুত বিশ্ব অর্থনীতিতে দামের ভারসাম্য রক্ষা করবে নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আভাসে উত্তাল জ্বালানি বাজার; এশিয়ায় সরবরাহ নিশ্চিতের তোড়জোড়

বিশ্ববাজারে ভাসমান ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল: আমদানিতে মুখিয়ে ভারত-চীন

Update Time : ০৮:২৫:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের দামামার মাঝে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে ইরান। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যেই জানা গেছে, সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে জাহাজে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড)। ওয়াশিংটন কর্তৃক তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ার আভাস পাওয়ায় এখন এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

 

 

বিশ্বখ্যাত জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের সিনিয়র ম্যানেজার ইমানুয়েল বেলোস্ট্রিনো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে চীনের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বিভিন্ন জাহাজে বর্তমানে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বা ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল মজুত রয়েছে। তবে ভিন্ন মত দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এসপেক্ট। তাদের ১৯ মার্চের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই মজুতের পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল। যদিও এই পরিমাণটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উৎপাদন ঘাটতির তুলনায় মাত্র ১৪ দিনের সরবরাহের সমান, তবুও অস্থিতিশীল বাজারে এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

 

 

এশীয় শোধনাগারে হাহাকার ও হরমুজ সংকট

এশিয়া মহাদেশের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিপাকে পড়েছে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় অনেক দেশ ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এই সংকটের মুহূর্তে ইরানের এই ভাসমান তেলের মজুত এশীয় দেশগুলোর জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।

 

 

ইরানি তেলের প্রধান গন্তব্য যেখানে

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে চীনই ছিল ইরানি তেলের প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য ক্রেতা। কেপলারের তথ্যমতে, গত বছর চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল কিনেছে। চীনের পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো একসময় ইরানের বড় আমদানিকারক ছিল।

বর্তমানে ভারতের শোধনাগারগুলো পুনরায় ইরানি তেল সংগ্রহের ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ দেখাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভারত সরকার এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধের শর্তাবলী নিয়ে স্বচ্ছতা পাওয়া গেলেই তারা আমদানির চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভারত যেভাবে রুশ তেল সংগ্রহ করেছিল, ঠিক সেভাবেই এখন ইরানের দিকে ঝুঁকছে দিল্লি।

 

 

জটিলতা ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’ চ্যালেঞ্জ

তবে এই তেল বাজারে আসা মোটেও সহজ নয়। আমদানিকারকদের জন্য প্রধান বাধা হলো অর্থ প্রদানের পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। এছাড়া সমুদ্রে থাকা তেলের একটি বড় অংশ তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজে পরিবহন করা হচ্ছে, যা বীমা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে। ২০১৮ সালের পর থেকে ইরানের সরাসরি তেল বিক্রির পথ সংকুচিত হওয়ায় বর্তমানে বড় একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেনাবেচা হচ্ছে, যা বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

পরিশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির সময়ে ১৭ কোটি ব্যারেল তেলের এই বিশাল মজুত বিশ্ব অর্থনীতিতে দামের ভারসাম্য রক্ষা করবে নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।