ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
স্লুইসগেট, দখল আর দূষণে মৃতপ্রায় নদীটি রক্ষায় আন্দোলনের ডাক

নদী আছে, পানি নেই

পানিশূন্য পাবনার বড়াল নদী। সংগৃহীত ছবি

 

এক সময়ের টইটুম্বর ও খরস্রোতা বড়াল নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। রাজশাহীর চারঘাট পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে নদী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যমুনা নদীতে মিশেছিল, তা আজ কেবলই এক সরু নালা বা খালের রূপ ধারণ করেছে।

 

 

জলহীন, যৌবনহীন এই বড়াল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে তার চিরচেনা জলধারা ফিরিয়ে আনার দাবি এখন এ অঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের। শীতকাল শুরুর আগেই চলনবিলের নদ-নদীগুলো যখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, তখন বড়ালের এই করুণ দশা পুরো অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

 

সরেজমিনে পাবনার চাটমোহর উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, এককালের প্রমত্তা বড়াল নদী এখন যেন এক ময়লা-আবর্জনার উন্মুক্ত ভাগাড়। চাটমোহর পৌরসভার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি ক্লিনিক, কাঁচাবাজার ও বাসাবাড়ির যাবতীয় বর্জ্যের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে শুকিয়ে যাওয়া এই নদী তলদেশ। নদীর দুই পাড় ক্রমান্বয়ে গ্রাস করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বসতবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি পুরোপুরি পানিশূন্য থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহার ও গোসলের পানির জন্য তীব্র সংকটে পড়ছেন। নদীটির তলদেশে এখন বর্জ্যের স্তূপ আর কচুরিপানার ঘন আস্তরণ, যা পুরো চাটমোহর এলাকায় মশা উৎপাদনের প্রধান সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে। নদীর পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধে দুপাড়ে সাধারণ মানুষের টেকা দায় হয়ে পড়েছে।

 

 

পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, আশির দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক চারঘাটে নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার পর থেকেই বড়ালের মৃত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হয়। পরবর্তীতে বাগাতিপাড়ার আটঘরি ও চাটমোহরের দহপাড়ায় আরও দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে সম্পূর্ণ শ্বাসরোধ করা হয়। এর ওপর চাটমোহর উপজেলা পরিষদ বড়ালের বুকে তিনটি আড়াআড়ি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ শুরু করলে নদীটি তার নাব্য চিরতরে হারিয়ে ফেলে। ২০০৮ সাল থেকে ‘বড়াল রক্ষা আন্দোলন’ কমিটির দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে চাটমোহরের তিনটি ক্রসবাঁধ ও দহপাড়া স্লুইসগেট অপসারণ করা হলেও, মূল খনন ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে গত দেড় দশকেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

 

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পাবনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট তোসলিম হাসান সুমন বলেন, “বড়াল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে যত দ্রুত সম্ভব এর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।” অন্যদিকে, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘টিএসপি’-র পরিচালক সরকার মোহাম্মদ আলি দাবি জানান, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী বড়াল নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান ও খনন কাজ শুরু করা উচিত।

 

 

বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস.এম. মিজানুর রহমান নদীর পুনর্জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, “রাজশাহীর চারঘাটে এবং নাটোরের আটঘরিতে নির্মিত ক্ষতিকারক স্লুইসগেটগুলো ভেঙে সেখানে পরিবেশবান্ধব বড় ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া, আটঘরি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার অংশ দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর সুপারিশ অনুযায়ী চারঘাট থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি পর্যন্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ছোট ছোট ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে ফেলে নদীটি পুনঃখনন করলেই কেবল ৫০ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।”

 

 

এই বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়ে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, “বড়াল নদী পুনঃখননের বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই বা ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ সম্পন্ন হয়েছে। এই স্টাডির রিপোর্টের আলোকেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বড়াল নদী পুনঃখনন ও এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।” স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকারি এই আশ্বাস যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থেকে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বড়াল নদী কেবল রূপকথার গল্প হয়ে না থাকে।

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

স্লুইসগেট, দখল আর দূষণে মৃতপ্রায় নদীটি রক্ষায় আন্দোলনের ডাক

নদী আছে, পানি নেই

Update Time : ১০:২২:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

পানিশূন্য পাবনার বড়াল নদী। সংগৃহীত ছবি

 

এক সময়ের টইটুম্বর ও খরস্রোতা বড়াল নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। রাজশাহীর চারঘাট পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে নদী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যমুনা নদীতে মিশেছিল, তা আজ কেবলই এক সরু নালা বা খালের রূপ ধারণ করেছে।

 

 

জলহীন, যৌবনহীন এই বড়াল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে তার চিরচেনা জলধারা ফিরিয়ে আনার দাবি এখন এ অঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের। শীতকাল শুরুর আগেই চলনবিলের নদ-নদীগুলো যখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, তখন বড়ালের এই করুণ দশা পুরো অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

 

সরেজমিনে পাবনার চাটমোহর উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, এককালের প্রমত্তা বড়াল নদী এখন যেন এক ময়লা-আবর্জনার উন্মুক্ত ভাগাড়। চাটমোহর পৌরসভার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি ক্লিনিক, কাঁচাবাজার ও বাসাবাড়ির যাবতীয় বর্জ্যের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে শুকিয়ে যাওয়া এই নদী তলদেশ। নদীর দুই পাড় ক্রমান্বয়ে গ্রাস করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বসতবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি পুরোপুরি পানিশূন্য থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহার ও গোসলের পানির জন্য তীব্র সংকটে পড়ছেন। নদীটির তলদেশে এখন বর্জ্যের স্তূপ আর কচুরিপানার ঘন আস্তরণ, যা পুরো চাটমোহর এলাকায় মশা উৎপাদনের প্রধান সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে। নদীর পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধে দুপাড়ে সাধারণ মানুষের টেকা দায় হয়ে পড়েছে।

 

 

পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, আশির দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক চারঘাটে নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার পর থেকেই বড়ালের মৃত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হয়। পরবর্তীতে বাগাতিপাড়ার আটঘরি ও চাটমোহরের দহপাড়ায় আরও দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে সম্পূর্ণ শ্বাসরোধ করা হয়। এর ওপর চাটমোহর উপজেলা পরিষদ বড়ালের বুকে তিনটি আড়াআড়ি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ শুরু করলে নদীটি তার নাব্য চিরতরে হারিয়ে ফেলে। ২০০৮ সাল থেকে ‘বড়াল রক্ষা আন্দোলন’ কমিটির দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে চাটমোহরের তিনটি ক্রসবাঁধ ও দহপাড়া স্লুইসগেট অপসারণ করা হলেও, মূল খনন ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে গত দেড় দশকেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

 

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পাবনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট তোসলিম হাসান সুমন বলেন, “বড়াল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে যত দ্রুত সম্ভব এর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।” অন্যদিকে, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘টিএসপি’-র পরিচালক সরকার মোহাম্মদ আলি দাবি জানান, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী বড়াল নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান ও খনন কাজ শুরু করা উচিত।

 

 

বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস.এম. মিজানুর রহমান নদীর পুনর্জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, “রাজশাহীর চারঘাটে এবং নাটোরের আটঘরিতে নির্মিত ক্ষতিকারক স্লুইসগেটগুলো ভেঙে সেখানে পরিবেশবান্ধব বড় ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া, আটঘরি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার অংশ দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর সুপারিশ অনুযায়ী চারঘাট থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি পর্যন্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ছোট ছোট ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে ফেলে নদীটি পুনঃখনন করলেই কেবল ৫০ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।”

 

 

এই বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়ে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, “বড়াল নদী পুনঃখননের বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই বা ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ সম্পন্ন হয়েছে। এই স্টাডির রিপোর্টের আলোকেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বড়াল নদী পুনঃখনন ও এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।” স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকারি এই আশ্বাস যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থেকে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বড়াল নদী কেবল রূপকথার গল্প হয়ে না থাকে।