ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা, পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ; স্রোতে শিশুর মৃত্যু

সংগৃহীত ছবি

 

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রলোভে কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখন পানির নিচে। এতে ৩ লাখের বেশি মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। গত দুই দিনে ঢলের পানিতে ভেসে এবং পাহাড় ধসে জেলায় নতুন করে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার চকরিয়া উপজেলায় নৌকায় চড়ে বন্যার পানি পার হওয়ার সময় স্রোতে ভেসে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামের এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়। তার অপর দুই বোনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও সদ্য গঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার নিচু এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়েছে। উজান তথা বান্দরবান শহর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি মাতামুহুরী নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল দ্রুত তলিয়ে যায়। শত শত ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় জরুরি মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

 

বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পেছনে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানবসৃষ্ট কিছু কারণকেও দায়ী করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক মাছের ঘের তৈরি করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা জলাবদ্ধতাকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া মাতামুহুরী নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে প্রভাবশালীরা অবৈধ মাছ ধরার ফাঁদ বসিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্লুইসগেটগুলো সময়মতো সচল না করায় পানি নামতে পারছে না। বৃহস্পতিবার রাতে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় বেড়িবাঁধের দুটি অংশ ধসে লোকালয়ে তীব্র বেগে পানি ঢুকলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে।

 

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে প্রায় ৬০০ মানুষকে ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার উপজেলায় এখনো ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি এবং পানি নামার গতি অত্যন্ত ধীর। অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে টানা সপ্তম দিনের মতো জাহাজ ও ট্রলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌরুটেও যোগাযোগ বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা, পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ; স্রোতে শিশুর মৃত্যু

Update Time : ১১:২২:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রলোভে কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখন পানির নিচে। এতে ৩ লাখের বেশি মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। গত দুই দিনে ঢলের পানিতে ভেসে এবং পাহাড় ধসে জেলায় নতুন করে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার চকরিয়া উপজেলায় নৌকায় চড়ে বন্যার পানি পার হওয়ার সময় স্রোতে ভেসে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামের এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়। তার অপর দুই বোনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও সদ্য গঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার নিচু এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়েছে। উজান তথা বান্দরবান শহর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি মাতামুহুরী নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল দ্রুত তলিয়ে যায়। শত শত ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় জরুরি মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

 

বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পেছনে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানবসৃষ্ট কিছু কারণকেও দায়ী করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক মাছের ঘের তৈরি করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা জলাবদ্ধতাকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া মাতামুহুরী নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে প্রভাবশালীরা অবৈধ মাছ ধরার ফাঁদ বসিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্লুইসগেটগুলো সময়মতো সচল না করায় পানি নামতে পারছে না। বৃহস্পতিবার রাতে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় বেড়িবাঁধের দুটি অংশ ধসে লোকালয়ে তীব্র বেগে পানি ঢুকলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে।

 

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে প্রায় ৬০০ মানুষকে ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার উপজেলায় এখনো ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি এবং পানি নামার গতি অত্যন্ত ধীর। অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে টানা সপ্তম দিনের মতো জাহাজ ও ট্রলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌরুটেও যোগাযোগ বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।