একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাহসের এক অনন্য প্রতীক। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকার রাজপথে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউরসহ নাম না জানা অনেক তরুণ।
সেই রক্তভেজা পথ ধরেই বাংলা ভাষা আজ বিশ্বদরবারে এক অনন্য সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে গভীর শ্রদ্ধার সাথে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে। তবে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথটি সহজ ছিল না; এর পেছনে রয়েছে দুই বাঙালি প্রবাসী ও তৎকালীন সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার ইতিহাস।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত দুই ভাষাপ্রেমী বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রথম প্রস্তাব পাঠান। সেই প্রস্তাবটি জাতিসংঘের তথ্য কর্মচারী হাসান ফেরদৌসের নজরে আসার পর তিনি রফিককে পরামর্শ দেন কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করার। এরপর রফিক ও সালাম ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করেন। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী, কানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশের যৌথ সমর্থনে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ১৮৮টি দেশের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এর ফলে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা বিশ্বে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ নয়; বরং এটি পৃথিবীর সকল ক্ষুদ্র ও বিপন্ন মাতৃভাষা রক্ষার এক শক্তিশালী বিশ্বজনীন অনুপ্রেরণা। ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ আর প্রবাসীদের একাগ্রতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজ অমর একুশে বিশ্বমানচিত্রে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 














