ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কুসংস্কার ও লোকসমাগম ঠেকাতে পুলিশ-ফায়ার সার্ভিসের যৌথ পদক্ষেপ

আখাউড়ার সেই ‘অলৌকিক’ কড়ই গাছ কেটে দিল প্রশাসন

ছবি : কালের কণ্ঠ

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় ঝড়ে উপড়ে পড়ার পর অলৌকিকভাবে আবার ‘দাঁড়িয়ে যাওয়া’ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই আলোচিত কড়ই গাছটি অবশেষে কেটে ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসন।

 

 

আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে আখাউড়া থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোগড়া ইউনিয়নের বচিয়ারা গ্রাম থেকে গাছটি গোড়া থেকে কেটে সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়। গত কয়েকদিন ধরে এই গাছটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে অন্ধবিশ্বাস ও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

 

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাস দেড়েক আগে কালবৈশাখী ঝড়ে বচিয়ারা গ্রামের মাহবুব মুন্সীর একটি বড় কড়ই গাছ শিকড়সহ মাটিতে উপড়ে পড়ে। গত কয়েকদিন ধরে গাছটি কাটার প্রক্রিয়া শুরু হলে হঠাৎ করেই এটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়—এমন দাবিকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে অলৌকিক ঘটনা মনে করে গাছটি দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কিছু অতিউৎসাহী মানুষ গাছটির গোড়ায় আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো, নগদ টাকা মানত করা এবং রোগমুক্তির আশায় গাছের শিকড় ও ছাল সংগ্রহ করার মতো অন্ধবিশ্বাসে লিপ্ত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘটনাটির ভিডিও ভাইরাল হলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।

 

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কফিল উদ্দিন মাহমুদ জানান, “গাছটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। এ ছাড়া এটিকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার এবং কুসংস্কার ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছিল। তাই জনস্বার্থে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, গাছের মূল মালিকের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং গাছ বিক্রির অর্থ স্থানীয় মসজিদ বা মাদরাসায় অনুদান হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

 

গাছটির মালিক মাহবুব মুন্সী এবং কাঠুরিয়া মো. আমিন মিয়া ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, মাটিতে শুয়ে থাকা গাছটির ডালপালা যখন কাটা হচ্ছিল, তখন ওপরের অংশের ভার একবারে কমে যায়। এরপরই গাছটি হঠাৎ করে সোজা হয়ে যায়। বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত হলেও গ্রামীণ জনপদে এটিকে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ কুদরত হিসেবে প্রচার করা হয়।

 

 

বিজ্ঞানমনস্ক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা শুরু থেকেই বিষয়টিকে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছিলেন। আখাউড়া বড়বাজারের বাসিন্দা মির্জা মারুফ ফেসবুকে লেখেন, ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছের ওপরের ডালপালা কাটার ফলে এর ওজন বা ‘রুট বলের’ ওপর চাপ কমে যায়। মাটির নিচে থাকা অক্ষত শিকড়ের টান ও মাটির নিজস্ব স্থিতিস্থাপকতার (Elasticity) কারণে এমন গাছ সোজা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

 

 

এটিকে অলৌকিক রূপ না দিতে তিনি আহ্বান জানান। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান ও সাবেক অধ্যক্ষ বিভূতিভূষণ সরকার বলেন, “কিছু গাছ ভারসাম্যের কারণে আংশিকভাবে সোজা হতে পারে। তবে কড়ই গাছের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না, এটি কিছুটা বিরল।” শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই ‘অলৌকিক’ গুজবের অবসান ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল।

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

কুসংস্কার ও লোকসমাগম ঠেকাতে পুলিশ-ফায়ার সার্ভিসের যৌথ পদক্ষেপ

আখাউড়ার সেই ‘অলৌকিক’ কড়ই গাছ কেটে দিল প্রশাসন

Update Time : ১০:৪৩:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

ছবি : কালের কণ্ঠ

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় ঝড়ে উপড়ে পড়ার পর অলৌকিকভাবে আবার ‘দাঁড়িয়ে যাওয়া’ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই আলোচিত কড়ই গাছটি অবশেষে কেটে ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসন।

 

 

আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে আখাউড়া থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোগড়া ইউনিয়নের বচিয়ারা গ্রাম থেকে গাছটি গোড়া থেকে কেটে সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়। গত কয়েকদিন ধরে এই গাছটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে অন্ধবিশ্বাস ও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

 

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাস দেড়েক আগে কালবৈশাখী ঝড়ে বচিয়ারা গ্রামের মাহবুব মুন্সীর একটি বড় কড়ই গাছ শিকড়সহ মাটিতে উপড়ে পড়ে। গত কয়েকদিন ধরে গাছটি কাটার প্রক্রিয়া শুরু হলে হঠাৎ করেই এটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়—এমন দাবিকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে অলৌকিক ঘটনা মনে করে গাছটি দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কিছু অতিউৎসাহী মানুষ গাছটির গোড়ায় আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো, নগদ টাকা মানত করা এবং রোগমুক্তির আশায় গাছের শিকড় ও ছাল সংগ্রহ করার মতো অন্ধবিশ্বাসে লিপ্ত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘটনাটির ভিডিও ভাইরাল হলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।

 

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কফিল উদ্দিন মাহমুদ জানান, “গাছটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। এ ছাড়া এটিকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার এবং কুসংস্কার ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছিল। তাই জনস্বার্থে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, গাছের মূল মালিকের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং গাছ বিক্রির অর্থ স্থানীয় মসজিদ বা মাদরাসায় অনুদান হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

 

গাছটির মালিক মাহবুব মুন্সী এবং কাঠুরিয়া মো. আমিন মিয়া ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, মাটিতে শুয়ে থাকা গাছটির ডালপালা যখন কাটা হচ্ছিল, তখন ওপরের অংশের ভার একবারে কমে যায়। এরপরই গাছটি হঠাৎ করে সোজা হয়ে যায়। বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত হলেও গ্রামীণ জনপদে এটিকে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ কুদরত হিসেবে প্রচার করা হয়।

 

 

বিজ্ঞানমনস্ক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা শুরু থেকেই বিষয়টিকে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছিলেন। আখাউড়া বড়বাজারের বাসিন্দা মির্জা মারুফ ফেসবুকে লেখেন, ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছের ওপরের ডালপালা কাটার ফলে এর ওজন বা ‘রুট বলের’ ওপর চাপ কমে যায়। মাটির নিচে থাকা অক্ষত শিকড়ের টান ও মাটির নিজস্ব স্থিতিস্থাপকতার (Elasticity) কারণে এমন গাছ সোজা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

 

 

এটিকে অলৌকিক রূপ না দিতে তিনি আহ্বান জানান। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান ও সাবেক অধ্যক্ষ বিভূতিভূষণ সরকার বলেন, “কিছু গাছ ভারসাম্যের কারণে আংশিকভাবে সোজা হতে পারে। তবে কড়ই গাছের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না, এটি কিছুটা বিরল।” শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই ‘অলৌকিক’ গুজবের অবসান ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল।