ঢাকা , রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মাঠের ধুলোবালি ছেড়ে ডিজিটালে আবদ্ধ শিশুরা, ভারসাম্য ফেরানোর তাগিদ

পর্দার ফাঁদে বন্দি শৈশব, হারিয়ে যাচ্ছে মুক্ত আকাশের আনন্দ

সংগৃহীত ছবি

 

একসময় বিকেল নামলেই দেশের গ্রাম কিংবা শহরের পাড়া-মহল্লার খোলা মাঠগুলোতে জমজমাট হয়ে উঠত শিশুদের উচ্ছ্বসিত ভিড়। ঘরের কোণে থরে থরে সাজানো স্কুলের ভারী ব্যাকপ্যাক নামিয়ে রেখে ধুলোমাখা মাঠে ছুটে যাওয়াই ছিল দিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। কারো হাতে থাকত মেঠো তৈরি কাঠের ব্যাট আর টেনিস বল, কেউবা মেতে উঠত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা— লুকোচুরি, কানামাছি, কিংবা চোর-পুলিশ ও কুমির-ডাঙায়।

 

মাঠের বুক চিরে ভেসে আসা বন্ধুদের উচ্চকিত হাসি, লাটিম ঘোরানো, রঙিন ঘুড়ি উড়ানো, মার্বেল খেলা কিংবা ঝড়ের দিনগুলোতে আম কুড়ানোর আনন্দে মিশে থাকা স্মৃতিগুলো শুধু বিনোদনের খোরাক ছিল না; সেগুলো ছিল একটি শিশুর পরিপূর্ণ সামাজিক ও মানসিক বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। গোধূলির আলো আঁধারে মায়ের স্নেহমাখা হাক— “বেশি দূরে যাস না, ঘরে ফের”— ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকত শৈশবের চিরায়ত এক সুন্দর আবেগ।

 

 

কিন্তু প্রযুক্তির আগ্রাসনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শৈশবের রূপ। সবুজ মাঠ, কাদামাটির স্পর্শ কিংবা মেঠো বাতাসের জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটারের নীল পর্দা। খোলা আকাশের নিচে যেখানে শৈশব ডানা মেলত, সেখানে চার দেয়ালের বন্দিদশায় কাচ ও প্লাস্টিকের ডিভাইসে আটকে পড়েছে আধুনিক প্রজন্ম। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একসময় মাঠের খেলায় শিশুরা অবচেতনভাবেই শিখত জীবনের নানা জটিল সমীকরণ।

 

 

মার্বেল খেলা শেখাত তীব্র মনোযোগ ও সঠিক লক্ষ্য স্থির করার কৌশল, লাটিম ঘোড়ানো শেখাত নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য। তেমনি লুকোচুরি বাড়াত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, চোর-পুলিশের দৌড়ঝাঁপ গড়ত তাত্ক্ষণিক বুদ্ধি ও কৌশলী পরিকল্পনা, আর দলগত ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা গড়ে তুলত পারস্পরিক নেতৃত্ব, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং হার-জিত মেনে নেওয়ার মানসিকতা। পর্দানির্ভর কৃত্রিম দুনিয়ায় আজ সেই অমূল্য সামাজিক শিক্ষাগুলো নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

 

বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির সুফল একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। অনলাইন শিক্ষা, সাধারণ জ্ঞান অর্জন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুরা ডিজিটাল সুবিধা পেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব জীবনের স্পর্শহীন শিক্ষা কখনো একটি শিশুর মানসিক বিকাশকে পূর্ণতা দিতে পারে না। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মাঠে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার মধ্য দিয়েই কেবল মস্তিষ্কে সুষম যোগাযোগ মাধ্যম ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে ওঠে। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, ঘরের বায়ুর বাইরের খেলার জায়গার সংকট এবং বাবা-মায়ের নিরাপত্তার অতিরিক্ত চিন্তা শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ, শিশুকাল মানেই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস ও বন্ধুদের সাথে মানিয়ে নেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যৎ জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি স্থাপন করে।

 

 

আজকের শিশুরা আধুনিক সব ডিজিটাল ডিভাইস পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা হারাচ্ছে মুক্ত প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক মেলবন্ধন। শৈশবের কাদামাটিতে পা পিছলে পড়ে যাওয়া, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফুটবল খেলা কিংবা ঝগড়ার পর মুহূর্তে আবার গায়ে হাত রেখে বন্ধু হয়ে যাওয়ার সেই অনন্য মাধুর্য স্ক্রিনের ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের মাঝে অনুপস্থিত।

 

 

শিশু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি মুছে ফেলা উদ্দেশ্য নয়, বরং শিশুর জীবনে পড়াশোনা, স্ক্রিন টাইম, খেলাধুলা ও সামাজিকভাবে মেলামেশার মধ্যে একটি সঠিক ও সুস্থ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। অভিভাবকদেরও সচেতন হয়ে সন্তানকে কিছুটা সময় হলেও খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। দিনশেষে একটি মাঠ, উন্মুক্ত আকাশ এবং কয়েকজন বন্ধুই পারে একটি শিশুর শৈশবকে পূর্ণতা দিতে; কারণ হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

 

 

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মেট্রোরেল স্টেশনে বোমা আতঙ্ক: তল্লাশির পর মিলল পান-জর্দার কৌটা

মাঠের ধুলোবালি ছেড়ে ডিজিটালে আবদ্ধ শিশুরা, ভারসাম্য ফেরানোর তাগিদ

পর্দার ফাঁদে বন্দি শৈশব, হারিয়ে যাচ্ছে মুক্ত আকাশের আনন্দ

Update Time : ১১:১০:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

একসময় বিকেল নামলেই দেশের গ্রাম কিংবা শহরের পাড়া-মহল্লার খোলা মাঠগুলোতে জমজমাট হয়ে উঠত শিশুদের উচ্ছ্বসিত ভিড়। ঘরের কোণে থরে থরে সাজানো স্কুলের ভারী ব্যাকপ্যাক নামিয়ে রেখে ধুলোমাখা মাঠে ছুটে যাওয়াই ছিল দিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। কারো হাতে থাকত মেঠো তৈরি কাঠের ব্যাট আর টেনিস বল, কেউবা মেতে উঠত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা— লুকোচুরি, কানামাছি, কিংবা চোর-পুলিশ ও কুমির-ডাঙায়।

 

মাঠের বুক চিরে ভেসে আসা বন্ধুদের উচ্চকিত হাসি, লাটিম ঘোরানো, রঙিন ঘুড়ি উড়ানো, মার্বেল খেলা কিংবা ঝড়ের দিনগুলোতে আম কুড়ানোর আনন্দে মিশে থাকা স্মৃতিগুলো শুধু বিনোদনের খোরাক ছিল না; সেগুলো ছিল একটি শিশুর পরিপূর্ণ সামাজিক ও মানসিক বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। গোধূলির আলো আঁধারে মায়ের স্নেহমাখা হাক— “বেশি দূরে যাস না, ঘরে ফের”— ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকত শৈশবের চিরায়ত এক সুন্দর আবেগ।

 

 

কিন্তু প্রযুক্তির আগ্রাসনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শৈশবের রূপ। সবুজ মাঠ, কাদামাটির স্পর্শ কিংবা মেঠো বাতাসের জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটারের নীল পর্দা। খোলা আকাশের নিচে যেখানে শৈশব ডানা মেলত, সেখানে চার দেয়ালের বন্দিদশায় কাচ ও প্লাস্টিকের ডিভাইসে আটকে পড়েছে আধুনিক প্রজন্ম। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একসময় মাঠের খেলায় শিশুরা অবচেতনভাবেই শিখত জীবনের নানা জটিল সমীকরণ।

 

 

মার্বেল খেলা শেখাত তীব্র মনোযোগ ও সঠিক লক্ষ্য স্থির করার কৌশল, লাটিম ঘোড়ানো শেখাত নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য। তেমনি লুকোচুরি বাড়াত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, চোর-পুলিশের দৌড়ঝাঁপ গড়ত তাত্ক্ষণিক বুদ্ধি ও কৌশলী পরিকল্পনা, আর দলগত ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা গড়ে তুলত পারস্পরিক নেতৃত্ব, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং হার-জিত মেনে নেওয়ার মানসিকতা। পর্দানির্ভর কৃত্রিম দুনিয়ায় আজ সেই অমূল্য সামাজিক শিক্ষাগুলো নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

 

বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির সুফল একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। অনলাইন শিক্ষা, সাধারণ জ্ঞান অর্জন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুরা ডিজিটাল সুবিধা পেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব জীবনের স্পর্শহীন শিক্ষা কখনো একটি শিশুর মানসিক বিকাশকে পূর্ণতা দিতে পারে না। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মাঠে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার মধ্য দিয়েই কেবল মস্তিষ্কে সুষম যোগাযোগ মাধ্যম ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে ওঠে। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, ঘরের বায়ুর বাইরের খেলার জায়গার সংকট এবং বাবা-মায়ের নিরাপত্তার অতিরিক্ত চিন্তা শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ, শিশুকাল মানেই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস ও বন্ধুদের সাথে মানিয়ে নেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যৎ জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি স্থাপন করে।

 

 

আজকের শিশুরা আধুনিক সব ডিজিটাল ডিভাইস পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা হারাচ্ছে মুক্ত প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক মেলবন্ধন। শৈশবের কাদামাটিতে পা পিছলে পড়ে যাওয়া, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফুটবল খেলা কিংবা ঝগড়ার পর মুহূর্তে আবার গায়ে হাত রেখে বন্ধু হয়ে যাওয়ার সেই অনন্য মাধুর্য স্ক্রিনের ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের মাঝে অনুপস্থিত।

 

 

শিশু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি মুছে ফেলা উদ্দেশ্য নয়, বরং শিশুর জীবনে পড়াশোনা, স্ক্রিন টাইম, খেলাধুলা ও সামাজিকভাবে মেলামেশার মধ্যে একটি সঠিক ও সুস্থ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। অভিভাবকদেরও সচেতন হয়ে সন্তানকে কিছুটা সময় হলেও খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। দিনশেষে একটি মাঠ, উন্মুক্ত আকাশ এবং কয়েকজন বন্ধুই পারে একটি শিশুর শৈশবকে পূর্ণতা দিতে; কারণ হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।