শাহরিয়ার আহমেদ ইমন
সাইপ্রাসে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি ছাত্র শাহরিয়ার আহমেদ ইমনের অপহরণ রহস্যে এক নতুন ও লোমহর্ষক মোড় এসেছে। অপহৃত ইমনের জীবনের বিনিময়ে অজ্ঞাতপরিচয় অপহরণকারীরা তাঁর পরিবারের কাছে সর্বমোট ৩৫,০০০ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ লাখ টাকা) মুক্তিপণ দাবি করেছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
টাকা না দিলে ইমনকে চিরতরে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, “পুলিশ বা কাউকে বললে তার মুখ আর কোনোদিন দেখতে পাবেনা।” চাঞ্চল্যকর এই ডিজিটাল বার্তা ও হুমকি সংবলিত স্ক্রিনশটগুলো এখন সাইপ্রাসের লার্নাকা জেলা পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কঠোর তদন্তের আওতায় রয়েছে। আজ সাইপ্রাসের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো পুলিশের বরাত দিয়ে এই রুদ্ধশ্বাস অপহরণের বিবরণ প্রকাশ করেছে।
লার্নাকা পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে ছড়িয়ে পড়া ও ইমনের বাবার কাছে পাঠানো প্রতিটি বার্তার সত্যতা নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। অপহরণকারীদের পাঠানো প্রথম বার্তায় গত রবিবার ১০,০০০ ইউরো এবং তার পরবর্তী সোমবারের মধ্যে আরও ২৫,০০০ ইউরো পরিশোধ করার জন্য চরম সময়সীমা (Deadline) বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ স্পষ্ট করেছে, জনসমক্ষে আসার অনেক আগে, অর্থাৎ তদন্তের একেবারে শুরু থেকেই এই সবকটি অডিও ও টেক্সট মেসেজ প্রশাসনের হাতে ছিল।
শুধু টেক্সটই নয়, পুলিশের বিশেষ তদন্ত দলের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাল্টিমিডিয়া ফাইল, ছবি ও ভয়েস নোট রয়েছে, যা ইমন নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোন থেকে পাঠানো বা আদান-প্রদান করা হয়েছিল। অপহৃতের জীবন রক্ষার্থে এবং নিখোঁজ এই ছাত্রকে জীবিত উদ্ধার করতে সাইপ্রাস প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তা নিচ্ছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইমন গত ১২ জুন বিকেল সাড়ে ৬টার দিকে ওরেক্লিনি (Oroklini) এলাকায় তাঁর বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা ফ্ল্যাট থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। তিনি তাঁর রুমমেটদের জানিয়েছিলেন, কোফিনু (Kofinou) এলাকার একটি কারখানায় আজ তাঁর প্রথম কাজের দিন। যেহেতু ইমনের নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত যানবাহন নেই, তাই পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে তিনি গণপরিবহন বা বাসে করে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। বর্তমানে ওরেক্লিনি থেকে কোফিনু যাওয়ার প্রতিটি বাসের রুট, বাসের ভেতরের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (CCTV) এবং স্টেশনের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পেরেছে, ১২ জুন কোফিনু এলাকাতেই ইমনের মোবাইল ফোনের সর্বশেষ সক্রিয় নেটওয়ার্ক সিগন্যাল বা ‘লাস্ট লোকেশন’ পাওয়া গিয়েছিল। সেই সিগন্যাল ট্র্যাক করে পুলিশ কোফিনুর বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে চিরুনি অভিযান ও তল্লাশি চালিয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো হদিস মেলেনি। নিখোঁজ হওয়ার দিন সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে ইমন একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিজের একটি সুনির্দিষ্ট ‘লাইভ লোকেশন’ পিন পাঠিয়েছিলেন। এর ঠিক পরপরই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ইমনের মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং তাঁর ফোন ব্যবহার করেই বিদেশে অবস্থানরত তাঁর বাবার সাথে যোগাযোগ করে। বাবার কাছে পাঠানো শেষ বার্তায় ইমনকে অপহরণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করে ভারী অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং এরপর থেকেই ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
যেহেতু শাহরিয়ার আহমেদ ইমন অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য সাইপ্রাসে অবস্থান করছিলেন, তাই দেশটির রাজনৈতিক বা সামাজিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি সীমিত ছিল। পুলিশ ইতিমধ্যেই ওরেক্লিনি ও লার্নাকায় ইমনের সংস্পর্শে আসা প্রতিটি roommates, বন্ধু ও সহপাঠীর মুখোমুখি জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। একই সাথে অন্য কোনো অপরাধী চক্র এর পেছনে জড়িত রয়েছে কিনা তা শনাক্ত করতে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। সাইপ্রাস সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে অবস্থানরত ইমনের পিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
লার্নাকা পুলিশ প্রশাসন এই তরুণ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে খুঁজে পেতে সর্বসাধারণের সহযোগিতা কামনা করেছে। ইমনের ছবি প্রকাশ করে পুলিশ জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তির কাছে এই অপহরণ বা ইমনের গতিবিধি সম্পর্কে সামান্যতম তথ্যও যদি জানা থাকে, তবে তারা যেন কালক্ষেপণ না করে লার্নাকা পুলিশের জরুরি নম্বর ২৪৮০৪০৯৬ বা ২৪৮০৪০৬০-এ সরাসরি কল করেন। এছাড়া সাইপ্রাস সিটিজেনস হটলাইন ১৪৬০ অথবা নিকটস্থ যেকোনো পুলিশ স্টেশনে তথ্য প্রদান করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সুত্র : ফাইলনিউজ.কম
















