প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য সেবনের ভয়াবহ ছোবলে প্রতি বছর এক লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বুকে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৮ জন মানুষ তামাকের বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ায় প্রাণ হারাচ্ছেন।
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে এই আঁতকে ওঠার মতো তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক এই তামাকবিরোধী সেমিনার ও বিভাগীয় ত্রৈমাসিক সভার আয়োজন করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়। সেমিনারের শুরুতে একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতা র্যালি শহর প্রদক্ষিণ করে।
বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ বা ‘কী-নোট পেপার’ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। উপস্থাপিত প্রবন্ধে দেশের তামাক ব্যবহারের ভয়ংকর চিত্র ফুটিয়ে তুলে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছেন। এছাড়া ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ তামাকের নীল দংশনের শিকার। দেশে প্রত্যক্ষভাবে ১ কোটি ninety-two লাখ মানুষ ধূমপান করলেও পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি আরও ভয়াবহ। দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ গণপরিবহনে, ৮১ লাখ মানুষ কর্মস্থলে এবং ৪ কোটিরও বেশি মানুষ নিজ বাসাবাড়িতে প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের (Second-hand smoking) শিকার হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। এর বাইরে জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও খৈনীর মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও সমানতালে বাড়ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, বাংলাদেশে মোট ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশই সরাসরি তামাক ব্যবহারকারী। এমনকি দেশের মোট মৃত্যুর ২ দশমিক ৫১ শতাংশের জন্য এককভাবে দায়ী পরোক্ষ ধূমপান। কেবল স্বাস্থ্যই নয়, পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর তামাকের আঘাত মারাত্মক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো থেকে ৪ হাজার ১৩৯টি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর সিগারেটের প্রায় ১৬ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত প্লাস্টিক ফিল্টার বর্জ্য হিসেবে এ দেশের মাটি ও পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “তামাকজনিত মরণব্যাধি, অকালমৃত্যু এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি বর্তমানে আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের একটি সমন্বিত ও ইস্পাতকঠিন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইনামুল হাছানের দক্ষ সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বক্তারা অবিলম্বে গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করার তাগিদ দেন।
















