গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটি একটি নেতিবাচক ধারণা হিসেবে পরিচিত। সহজ কথায়, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যখন নির্বাচনের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে নিজেদের অনুকূলে ফলাফল আনার জন্য পর্দার আড়ালে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, তাকেই ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হয়। এটি ভোট জালিয়াতি বা সরাসরি কেন্দ্র দখলের মতো স্থূল প্রক্রিয়া নয়; বরং এর চেয়ে অনেক বেশি সুক্ষ্ম ও পদ্ধতিগত। ভোটারদের প্রভাবিত করা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়ানো কিংবা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনমতকে নিজেদের বাক্সে বন্দি করাই হলো ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মূল লক্ষ্য।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতের ঘোষিত ৪১ দফার ‘জনতার ইশতেহার’ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতিকে অনেকেই তাদের ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া এবং তাতে বঙ্গভবনের আইটি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার ঘটনাটি নির্বাচনপূর্ব সাইবার যুদ্ধের একটি খণ্ডচিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—জামায়াত কি মাঠের রাজনীতির চেয়ে পর্দার আড়ালের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে বেশি মনোযোগী?
তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই অভিযোগ বরাবরের মতোই নাকচ করা হয়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, তাদের বিপুল জনসমর্থন এবং সুসংগঠিত ক্যাডার ভিত্তিক কাঠামোর কারণেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ঈর্ষান্বিত হয়ে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর তকমা দিচ্ছে। তারা বলছেন, দীর্ঘ দেড় দশক রাজপথ থেকে দূরে থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম মাত্র। জামায়াতের এই ‘আধুনিকায়ন’ সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে নাকি সূক্ষ্ম কোনো নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করবে, তা নিয়ে বোদ্ধামহলে বিতর্ক চলছে।
অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারাও সম্প্রতি জামায়াতের নাম না নিয়ে ‘গুপ্ত দল’ ও ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে তাদের অভিযুক্ত করেছেন। নির্বাচন কমিশন ও ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের এই আবহে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা জনমনে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি কোনো বিশেষ দল যেন পর্দার আড়াল থেকে ভোটের ফলাফল নিয়ন্ত্রণের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্পাদকীয় ডেস্ক 

























