সংগৃহীত ছবি
গরম ভাতের ধোঁয়ার সঙ্গে সরিষার ঝাঁজ, কাঁচা মরিচ আর এক টুকরো ভাজা ইলিশ—বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি ও রসনা বিলাসে এর চেয়ে প্রিয় কিংবা লোভনীয় মেলবন্ধন খুব কমই আছে। তবে চড়া দামে বাজার থেকে মাছ কিনে আনার পর যদি রান্নার সময় সেই কাঙ্ক্ষিত পরিচিত সুবাস ও অতুলনীয় স্বাদ না মেলে, তবে পুরো আয়োজনটাই যেন মাটি হয়ে যায়।
বর্তমানে বাজারে কেবল পদ্মা বা মেঘনার ইলিশই নয়, বরং ভারতের গুজরাটের ভারুচসহ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ আমদানিকৃত হয়ে আসছে। দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল পদ্মার ইলিশ চেনা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেকেই না বুঝে কম স্বাদের মাছ কিনে প্রতারিত ও হতাশ হচ্ছেন।
প্রকৃতিগতভাবেই নদীর বেড়ে ওঠা ইলিশ এবং সামুদ্রিক বা উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণে আকাশ-পাতাল তফাৎ থাকে। বিশেষজ্ঞরা জানান, চট্টগ্রামের দিকে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় ভারুচ অঞ্চল থেকে চড়া মূল্যে বড় আকারের ইলিশ নিয়ে আসা হয়। এসব ইলিশ ওজনে ভারী ও দেখতে চটকদার হলেও পদ্মার ইলিশের মূল বৈশিষ্ট্য—যেমন শরীরের প্রাকৃতিক তেল, তুলনামূলক নরম মাংস এবং রান্নার সময় ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সেই বিখ্যাত সুবাস—এর অধিকাংশ থেকেই বঞ্চিত।
তাই বাজারে গিয়ে ঠকে যাওয়া এড়াতে মাছের শারীরবৃত্তীয় কিছু সাধারণ লক্ষণ ভালোভাবে খেয়াল করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, ইলিশের গড়ন থেকে নদীর ইলিশের বড় ইঙ্গিত মেলে। পদ্মার ইলিশ মূলত কিছুটা মোটা, গোলগাল ও চওড়া হয় এবং এর পেটের অংশ বেশ ভরাট থাকে। পক্ষান্তরে গুজরাট বা সামুদ্রিক ইলিশের গড়ন হয় তুলনামূলক লম্বাটে, সরু ও কিছুটা চ্যাপ্টা। দ্বিতীয়ত, মাছের চোখের দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক। আসল পদ্মার সতেজ ইলিশের চোখ হয় পরিষ্কার, উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ। কিন্তু গুজরাটের ইলিশের চোখের চারপাশ কিছুটা কালচে-লাল বা রক্তবর্ণ ধারণ করে থাকে।
তাছাড়া মাছের মাথা, পেট ও লেজের অনুপাতেও পার্থক্য স্পষ্ট চোখে পড়ে। পদ্মার ইলিশের মাথাটি শরীরের তুলনায় কিছুটা ছোট ও সরু দেখায়। অন্যদিকে গুজরাটি বা সামুদ্রিক ইলিশের মাথা ও লেজের অংশ পুরো শরীরের তুলনায় কিছুটা অস্বাভাবিক বড় বা অসমান মনে হয়। পাশাপাশি মাছের শরীরের রঙের ওপর নজর রাখা দরকার। তাজা পদ্মার ইলিশ রূপালী চাদরের মতো ঝলমল করে, যার পিঠের দিকে হালকা নীলচে-ধূসর আভাও লক্ষ্য করা যায়। তবে দীর্ঘদিন বরফে সংরক্ষিত থাকলে বা সামুদ্রিক মাছের গায়ে কালচে কিংবা তামাটে ছোপ দেখা যেতে পারে।
বাজার থেকে ইলিশ কেনার সময় কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যদি দেখেন মাছের কানকো ফ্যাকাশে, লেজ ঢলে পড়া নরম, চোখ ঘোলাটে কিংবা গায়ের আঁশ খসখসে বা উজ্জ্বলতাহীন—তবে সেই মাছ কেনা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ভালো স্বাদের ইলিশ নিশ্চিত করতে হলে সতেজতা, শক্ত লেজ, ভরাট পেট এবং উজ্জ্বল রুপালি আঁশযুক্ত মাঝারি বা বড় সাইজের মাছ বেছে নেওয়া শ্রেয়। সামান্য একটু সময় নিয়ে এসব বাহ্যিক লক্ষণ পরখ করে কিনলে চড়া দামের ইলিশ পাতে এনে দেবে সত্যিকারের খাঁটি তৃপ্তি।
সূত্র : বিবিসি, হিন্দুস্তান টাইমস

















