ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গ্রামাঞ্চলে ১২ ঘণ্টার লোডশেডিং, এলএনজি সংকটে ব্যাহত বিদ্যুৎ

লোডশেডিং নিয়ে বাড়ছে জনরোষ, ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ

ছবি: সংগৃহীত

 

সারা দেশে মারাত্মক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। এর জেরে দেশের গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। বিদ্যুৎ না পেয়ে ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ গ্রাহকদের তীব্র জনরোষ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস ও উপকেন্দ্রগুলোতে। ইতোমধ্যেই দেশের একাধিক অঞ্চলে বিদ্যুতের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষুব্ধ জনতার হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।

 

 

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে নিজেদের অবকাঠামো ও কর্মীদের সুরক্ষায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)-এর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে।

 

 

বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত এই আবেদনপত্রটি পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়। চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চেয়ে পাঠানো আবেদনটি পুলিশ সদর দফতরে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, “শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষায় পুলিশ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের জাতীয় গুরুত্ব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি।”

 

 

পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের পাঠানো উক্ত চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, চরম জ্বালানি সংকট এবং একই সাথে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে সেবা দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। তা ছাড়া মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই তাদের আওতাধীন গ্রামীণ এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

 

 

তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো সরাসরি কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, বরং জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বরাদ্দই গ্রাহকদের মাঝে বণ্টন করে থাকে। গত কয়েক দিনে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপুল এই ঘাটতির কারণে গ্রামজুড়ে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র জনরোষ তৈরি করছে এবং তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উপকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছেন। এ কারণে অবিলম্বে প্রতিটি গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য আইজিপিকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।

 

 

এদিকে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়া ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়াকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না এবং এক্সেলারেট এনার্জির টার্মিনালও দুর্ঘটনার পর পুরোদমে চালনা করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং তৈরি হয়েছে।

 

 

সংকট সামাল দিতে সরকার মালয়েশিয়া থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিশেষ আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে গ্যাস আনার বিকল্প পথও খতিয়ে দেখছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সেই সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবারের নেওয়া একটি বিশেষ কৌশল আজ থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটাতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

 

 

অতীতের নীতিগত ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভুল নীতি গ্রহণ করলে এক সময় না এক সময় তার মাসুল দিতেই হয়।” তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া সংক্রান্ত চিঠিটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

 

 

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রামাঞ্চলে ১২ ঘণ্টার লোডশেডিং, এলএনজি সংকটে ব্যাহত বিদ্যুৎ

লোডশেডিং নিয়ে বাড়ছে জনরোষ, ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ

Update Time : ০৭:২১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

 

সারা দেশে মারাত্মক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। এর জেরে দেশের গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। বিদ্যুৎ না পেয়ে ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ গ্রাহকদের তীব্র জনরোষ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস ও উপকেন্দ্রগুলোতে। ইতোমধ্যেই দেশের একাধিক অঞ্চলে বিদ্যুতের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষুব্ধ জনতার হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।

 

 

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে নিজেদের অবকাঠামো ও কর্মীদের সুরক্ষায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)-এর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে।

 

 

বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত এই আবেদনপত্রটি পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়। চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চেয়ে পাঠানো আবেদনটি পুলিশ সদর দফতরে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, “শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষায় পুলিশ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের জাতীয় গুরুত্ব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি।”

 

 

পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের পাঠানো উক্ত চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, চরম জ্বালানি সংকট এবং একই সাথে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে সেবা দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। তা ছাড়া মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই তাদের আওতাধীন গ্রামীণ এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

 

 

তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো সরাসরি কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, বরং জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বরাদ্দই গ্রাহকদের মাঝে বণ্টন করে থাকে। গত কয়েক দিনে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপুল এই ঘাটতির কারণে গ্রামজুড়ে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র জনরোষ তৈরি করছে এবং তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উপকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছেন। এ কারণে অবিলম্বে প্রতিটি গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য আইজিপিকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।

 

 

এদিকে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়া ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়াকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না এবং এক্সেলারেট এনার্জির টার্মিনালও দুর্ঘটনার পর পুরোদমে চালনা করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং তৈরি হয়েছে।

 

 

সংকট সামাল দিতে সরকার মালয়েশিয়া থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিশেষ আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে গ্যাস আনার বিকল্প পথও খতিয়ে দেখছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সেই সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবারের নেওয়া একটি বিশেষ কৌশল আজ থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটাতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

 

 

অতীতের নীতিগত ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভুল নীতি গ্রহণ করলে এক সময় না এক সময় তার মাসুল দিতেই হয়।” তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া সংক্রান্ত চিঠিটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।