সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর যানজটমুক্ত যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় ও নান্দনিক মাধ্যম হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস এখন গভীর সংকটের মুখে। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে এই রুটের অর্ধেকের বেশি ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেবাটি যেকোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও চালকেরা। মূলত গত ঈদুল ফিতরের পর থেকেই ডিজেল সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বাড্ডা, রামপুরা, গুলশান ও কারওয়ানবাজার এলাকায় যাতায়াতের জন্য এই জলপথ ব্যবহার করেন। বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয়ে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে ট্যাক্সি চালানো হচ্ছে। আগে যেখানে মাত্র ৫-৭ জন যাত্রী হলেই ঘাট থেকে ট্যাক্সি ছেড়ে যেত, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২৫ জন যাত্রী না হওয়া পর্যন্ত ইঞ্জিন চালু করছেন না চালকেরা। এর ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রী এবং শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
সংকটের চিত্র ও রেশনিং ব্যবস্থা:
হাতিরঝিল প্রকল্পের এফডিসি, রামপুরা সেতু, গুদারাঘাট ও পুলিশ প্লাজা—এই চারটি রুটে মোট ১৫টি ট্যাক্সির মধ্যে আগে ১২-১৩টি নিয়মিত চলাচল করত। বর্তমানে জ্বালানি স্বল্পতায় অর্ধেকের বেশি ট্যাক্সি ঘাটে অলস বসে থাকছে। প্রতিটি ট্যাক্সির জন্য দিনে গড়ে ৩০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হলেও এখন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ লিটার। এই পরিমাণ তেল দিয়ে বড়জোর ৪ ঘণ্টা ইঞ্জিন চালানো সম্ভব। ফলে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ১১টা এবং বিকেল ৪টার পর থেকে ‘পিক আওয়ার’ কোনোমতে সামাল দেওয়া হলেও দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সার্ভিস প্রায় বন্ধ থাকছে।
এফডিসি ঘাটের টিকিট চেকার সাইফুল ইসলাম জানান, ১৫টির মধ্যে বর্তমানে ৪টি ট্যাক্সি বিকল হয়ে আছে, আর বাকিগুলো কেবল ভিড়ের সময় চালানো হচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল না থাকায় তারা চাইলেও নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না।
যাত্রী ভোগান্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
সরেজমিনে এফডিসি ও রামপুরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীরা টিকিট কেটে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় আছেন। রিপা চাকমা নামে এক নিয়মিত যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে ১০ মিনিট পরপর ট্যাক্সি পাওয়া যেত, এখন ৪৫ মিনিট ধরে বসে আছি। এভাবে চললে বিকল্প পথ বেছে নিতে হবে।” তেজগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমন মিয়ার মতে, অতিরিক্ত যাত্রী তোলার আশায় চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সির জেটি ইন-চার্জ মো. জয়নাল আবেদীন জানান, তাদের দৈনিক চাহিদা ৩৫০ থেকে ৪০০ লিটার হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২০০ লিটারের মতো। কোনো রিজার্ভ তেল না থাকায় সার্ভিস টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের অপারেশনস ম্যানেজার মোরশেদুল আলম বলেন, “গত ১০ বছরে আমরা এমন সংকটে পড়িনি। আয় অর্ধেক হয়ে গেছে। ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সেবাটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।”
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এই সেবা চালু হয়েছিল, যা গত কয়েক বছরে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি আস্থার জায়গা তৈরি করেছিল। এখন সরকারি বা সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই জনপ্রিয় সেবাটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অনলাইন ডেস্ক 
























