ঢাকা , শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
টিকাদানের ঘাটতি ও অপুষ্টিতে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

মহামারিতে রূপ নিতে পারে হাম: জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক অশনিসংকেত

ছবি : কালের কণ্ঠ

 

বাংলাদেশে একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম (Measles) আবারও উদ্বেগজনকভাবে ফিরে আসায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় এই অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

 

 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ‘ভাইরাল জিনোমিক্স অ্যান্ড ইনফেকশন ডাইনামিক্স ল্যাবরেটরির’ পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. গোলজার হোসেন এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টিকাদানের ঘাটতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং দেশের অতিরিক্ত জনঘনত্ব—এই তিনটি প্রধান কারণে হাম আবারও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের এই অধ্যাপক জানান, হাম একটি মারাত্মক বায়ুবাহিত রোগ যা ‘Measles Virus’ দ্বারা সৃষ্ট। এটি এতটাই সংক্রামক যে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

 

 

ড. গোলজার সতর্ক করে বলেন, “একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে প্রায় ১৮ জন নতুন মানুষ সংক্রমিত হতে পারে, যা এই রোগের ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়।” বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশু এবং ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের জন্যও হাম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

 

হামের লক্ষণ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে অধ্যাপক গোলজার বলেন, সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, কাশি এবং চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে মুখের ভেতরে সাদা দাগ এবং সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

 

সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি অন্ধত্বের মতো স্থায়ী শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তার মতে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী হাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

 

রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মিসেস মিনারা খাতুন জানান, বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়, যা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তিনি শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা নিশ্চিত করা, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং টিকা নিয়ে সমাজের ভুল ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

 

 

তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ না নিলে হাম আবারও মহামারির রূপ নিতে পারে। উল্লেখ্য, বাকৃবির ভাইরাল জিনোমিক্স ল্যাবরেটরিটি বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ মহামারি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মহামারিতে রূপ নিতে পারে হাম: জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক অশনিসংকেত

টিকাদানের ঘাটতি ও অপুষ্টিতে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

মহামারিতে রূপ নিতে পারে হাম: জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক অশনিসংকেত

Update Time : ০৭:৫০:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

ছবি : কালের কণ্ঠ

 

বাংলাদেশে একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম (Measles) আবারও উদ্বেগজনকভাবে ফিরে আসায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় এই অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

 

 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ‘ভাইরাল জিনোমিক্স অ্যান্ড ইনফেকশন ডাইনামিক্স ল্যাবরেটরির’ পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. গোলজার হোসেন এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টিকাদানের ঘাটতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং দেশের অতিরিক্ত জনঘনত্ব—এই তিনটি প্রধান কারণে হাম আবারও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের এই অধ্যাপক জানান, হাম একটি মারাত্মক বায়ুবাহিত রোগ যা ‘Measles Virus’ দ্বারা সৃষ্ট। এটি এতটাই সংক্রামক যে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

 

 

ড. গোলজার সতর্ক করে বলেন, “একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে প্রায় ১৮ জন নতুন মানুষ সংক্রমিত হতে পারে, যা এই রোগের ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়।” বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশু এবং ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের জন্যও হাম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

 

হামের লক্ষণ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে অধ্যাপক গোলজার বলেন, সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, কাশি এবং চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে মুখের ভেতরে সাদা দাগ এবং সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

 

সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি অন্ধত্বের মতো স্থায়ী শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তার মতে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী হাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

 

রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মিসেস মিনারা খাতুন জানান, বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়, যা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তিনি শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা নিশ্চিত করা, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং টিকা নিয়ে সমাজের ভুল ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

 

 

তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ না নিলে হাম আবারও মহামারির রূপ নিতে পারে। উল্লেখ্য, বাকৃবির ভাইরাল জিনোমিক্স ল্যাবরেটরিটি বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ মহামারি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।