ঢাকা , শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তোলপাড়, প্রকৃত রহস্য সন্ধানে প্রশাসন

বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর: নিষ্ঠুরতা নাকি নিছক দুর্ঘটনা?

সংগৃহীত ছবি

 

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের হাতে একটি কুকুরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

 

গত বুধবার (৮ এপ্রিল) ঘটে যাওয়া এই ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, দিঘির সিঁড়িতে অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুকুরকে অদূরে ধেয়ে আসা একটি কুমির মুহূর্তের মধ্যে কামড়ে পানির নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ এই ঘটনাকে ‘মনুষ্যত্বহীনতা’ এবং ‘পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও মাজার কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি—বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

 

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরটির সামনের পা পানির কাছাকাছি থাকায় এবং মানুষজনের নিষ্ক্রিয় অবস্থানের কারণে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে, কুকুরটির পা বেঁধে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের আধার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন মাজারের নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার সময় নীল ইউনিফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান জানান, কুকুরটি কয়েকদিন ধরেই মাজার এলাকায় অস্বাভাবিক আচরণ করছিল।

 

সেটি সম্ভবত জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল এবং যাকে সামনে পাচ্ছিল তাকেই কামড়াতে যাচ্ছিল। ফোরকানের দাবি অনুযায়ী, কুকুরটি তাকেও আক্রমণ করে এবং এক পর্যায়ে পা ঝাড়া দিলে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিঘির পানির ধাপে পড়ে যায়। অসুস্থতার কারণে কুকুরটি আর ওপরে উঠতে পারছিল না।

 

 

মাজারের ঘাটের দোকানি বিনা ফকিরও একই সুর মেলালেন। তিনি জানান, কুকুরটি তার দোকানের সামনে একটি শিশু ও তার মুরগিকে আক্রমণ করেছিল। জলাতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এবং কুমিরের উপস্থিতির কারণে প্রাণের ভয়ে কেউ সেটিকে উদ্ধারের সাহস দেখাননি। মাজারের খাদেম মেহেদী হাসান তপু স্পষ্ট করে বলেন, “মাজারে কোনো অপকর্ম হয় না। কুমিরের খাবারের অভাব নেই যে কুকুর বেঁধে খাওয়াতে হবে। কুকুরটি নিজেই পানিতে পড়ে গিয়েছিল।”

 

 

এদিকে, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অফ ভেটেনারি মেডিসিন ডা. ভীষ্মদেব রায় জানান, জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীদের মধ্যে ‘হাইড্রোফোবিয়া’ বা পানিবীতি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় পানির কাছাকাছি গেলে স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে কুকুরটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

 

 

জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও ধোঁয়াশা নিরসনে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

 

ইতিমধ্যেই মাটিচাপা দেওয়া কুকুরটির মৃতদেহ তুলে মাথার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পরীক্ষার জন্য ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হচ্ছে। ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে কুকুরটি সত্যিই জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল কি না। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর

ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তোলপাড়, প্রকৃত রহস্য সন্ধানে প্রশাসন

বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর: নিষ্ঠুরতা নাকি নিছক দুর্ঘটনা?

Update Time : ০৭:২৯:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের হাতে একটি কুকুরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

 

গত বুধবার (৮ এপ্রিল) ঘটে যাওয়া এই ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, দিঘির সিঁড়িতে অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুকুরকে অদূরে ধেয়ে আসা একটি কুমির মুহূর্তের মধ্যে কামড়ে পানির নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ এই ঘটনাকে ‘মনুষ্যত্বহীনতা’ এবং ‘পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও মাজার কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি—বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

 

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরটির সামনের পা পানির কাছাকাছি থাকায় এবং মানুষজনের নিষ্ক্রিয় অবস্থানের কারণে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে, কুকুরটির পা বেঁধে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের আধার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন মাজারের নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার সময় নীল ইউনিফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান জানান, কুকুরটি কয়েকদিন ধরেই মাজার এলাকায় অস্বাভাবিক আচরণ করছিল।

 

সেটি সম্ভবত জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল এবং যাকে সামনে পাচ্ছিল তাকেই কামড়াতে যাচ্ছিল। ফোরকানের দাবি অনুযায়ী, কুকুরটি তাকেও আক্রমণ করে এবং এক পর্যায়ে পা ঝাড়া দিলে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিঘির পানির ধাপে পড়ে যায়। অসুস্থতার কারণে কুকুরটি আর ওপরে উঠতে পারছিল না।

 

 

মাজারের ঘাটের দোকানি বিনা ফকিরও একই সুর মেলালেন। তিনি জানান, কুকুরটি তার দোকানের সামনে একটি শিশু ও তার মুরগিকে আক্রমণ করেছিল। জলাতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এবং কুমিরের উপস্থিতির কারণে প্রাণের ভয়ে কেউ সেটিকে উদ্ধারের সাহস দেখাননি। মাজারের খাদেম মেহেদী হাসান তপু স্পষ্ট করে বলেন, “মাজারে কোনো অপকর্ম হয় না। কুমিরের খাবারের অভাব নেই যে কুকুর বেঁধে খাওয়াতে হবে। কুকুরটি নিজেই পানিতে পড়ে গিয়েছিল।”

 

 

এদিকে, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অফ ভেটেনারি মেডিসিন ডা. ভীষ্মদেব রায় জানান, জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীদের মধ্যে ‘হাইড্রোফোবিয়া’ বা পানিবীতি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় পানির কাছাকাছি গেলে স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে কুকুরটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

 

 

জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও ধোঁয়াশা নিরসনে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

 

ইতিমধ্যেই মাটিচাপা দেওয়া কুকুরটির মৃতদেহ তুলে মাথার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পরীক্ষার জন্য ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হচ্ছে। ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে কুকুরটি সত্যিই জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল কি না। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।