ঢাকা , শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড় ও চিকিৎসা সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

বরিশালে মহামারি আকারে হাম: ৪৮ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু

হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুকে আদর করছেন তার স্বজন। সংগৃহীত ছবি

 

বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। সাধারণ জ্বর-সর্দি ভেবে অবহেলা করার পর গায়ে লালচে দানা ওঠার আগেই কেড়ে নিচ্ছে কোমলমতি শিশুদের প্রাণ। মুলাদীর কাজিরচর এলাকার দুই বছর বয়সী সা‌দিয়া কিংবা বানারীপাড়ার ৯ মাসের শিশু রাকিব—সবার গল্পের শুরুটা একই রকম ছিল। সামান্য জ্বর আর সর্দি দেখে মায়েরা ভেবেছিলেন সাধারণ ঠান্ডা লেগেছে।

 

কিন্তু সেই ভুল ভাঙতে ভাঙতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই প্রাণ হারিয়েছে চারজন শিশু, আর চলতি বছর বিভাগে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।

 

 

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যা ছাপিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে মুমূর্ষু শিশুদের চিকিৎসা।

 

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৩১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ৯২ জন। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা থেকেই রোগীরা এই একটি হাসপাতালে ছুটে আসায় তৈরি হয়েছে চরম হাহাকার। মৃত শিশুদের প্রত্যেকেই হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে এসেছিল।

 

 

চিকিৎসকদের মতে, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা এর বিভ্রান্তিকর লক্ষণ। শিশু ওয়ার্ডের প্রধান ডা. বিকাশ নাগ বলেন, “শুরুতে হালকা জ্বর ও কাশির কারণে মায়েরা একে সাধারণ সর্দি ভাবেন। কিন্তু দুই-তিন দিন পর চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার পর যখন তারা হাসপাতালে আসেন, ততক্ষণে সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নেয়।

 

 

” ১ হাজার ৮০ জন আক্রান্ত শিশুর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় মাত্র ৫২ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে, বাকিদের চিকিৎসা চলছে উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে। ল্যাব পরীক্ষার এই সীমাবদ্ধতা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এই সংকটের পেছনে টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অনীহা দেখা গেছে, যার ফলশ্রুতিতে এখন মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

 

চিকিৎসকদের পরামর্শ—জ্বরের সঙ্গে যদি চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ফুসকুড়ি ওঠার অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। রহিমার মতো শত শত মায়ের আর্তনাদ থামানোর একমাত্র উপায় এখন দ্রুত শনাক্তকরণ এবং গণসচেতনতা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

তরমুজের খোসা ও বীজে লুকিয়ে আছে মহৌষধি গুণ

হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড় ও চিকিৎসা সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

বরিশালে মহামারি আকারে হাম: ৪৮ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু

Update Time : ০৬:৩৪:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুকে আদর করছেন তার স্বজন। সংগৃহীত ছবি

 

বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। সাধারণ জ্বর-সর্দি ভেবে অবহেলা করার পর গায়ে লালচে দানা ওঠার আগেই কেড়ে নিচ্ছে কোমলমতি শিশুদের প্রাণ। মুলাদীর কাজিরচর এলাকার দুই বছর বয়সী সা‌দিয়া কিংবা বানারীপাড়ার ৯ মাসের শিশু রাকিব—সবার গল্পের শুরুটা একই রকম ছিল। সামান্য জ্বর আর সর্দি দেখে মায়েরা ভেবেছিলেন সাধারণ ঠান্ডা লেগেছে।

 

কিন্তু সেই ভুল ভাঙতে ভাঙতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই প্রাণ হারিয়েছে চারজন শিশু, আর চলতি বছর বিভাগে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।

 

 

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যা ছাপিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে মুমূর্ষু শিশুদের চিকিৎসা।

 

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৩১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ৯২ জন। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা থেকেই রোগীরা এই একটি হাসপাতালে ছুটে আসায় তৈরি হয়েছে চরম হাহাকার। মৃত শিশুদের প্রত্যেকেই হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে এসেছিল।

 

 

চিকিৎসকদের মতে, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা এর বিভ্রান্তিকর লক্ষণ। শিশু ওয়ার্ডের প্রধান ডা. বিকাশ নাগ বলেন, “শুরুতে হালকা জ্বর ও কাশির কারণে মায়েরা একে সাধারণ সর্দি ভাবেন। কিন্তু দুই-তিন দিন পর চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার পর যখন তারা হাসপাতালে আসেন, ততক্ষণে সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নেয়।

 

 

” ১ হাজার ৮০ জন আক্রান্ত শিশুর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় মাত্র ৫২ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে, বাকিদের চিকিৎসা চলছে উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে। ল্যাব পরীক্ষার এই সীমাবদ্ধতা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এই সংকটের পেছনে টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অনীহা দেখা গেছে, যার ফলশ্রুতিতে এখন মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

 

চিকিৎসকদের পরামর্শ—জ্বরের সঙ্গে যদি চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ফুসকুড়ি ওঠার অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। রহিমার মতো শত শত মায়ের আর্তনাদ থামানোর একমাত্র উপায় এখন দ্রুত শনাক্তকরণ এবং গণসচেতনতা।