ছবি : রয়টার্স
দীর্ঘ ৪০ দিনের বিধ্বংসী সংঘাতের পর অবশেষে প্রশান্তির ইঙ্গিত মিলছে মধ্যপ্রাচ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বুধবার দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দেশগুলো। তবে এই ৪০ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে লাশের সারি। নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে কয়েক হাজার, যার মধ্যে সাধারণ বেসামরিক নাগরিক থেকে শুরু করে শিশু এবং সাংবাদিকও রয়েছেন।
যুদ্ধের সূত্রপাত ও বৈশ্বিক প্রভাব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালালে এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের সূচনা হয়। ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি; তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় স্থবির হয়ে পড়ে লোহিত সাগরসহ সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের নৌপথ, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ববাণিজ্যের ওপর। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ায় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়।
প্রাণহানির পরিসংখ্যান: ইরান ও লেবানন শীর্ষে
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে ইরানে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর মতে, ইরানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৩৬ জন। তবে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট এই সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, লেবানন পরিণত হয়েছিল দ্বিতীয় রণক্ষেত্রে। ২ মার্চ থেকে চলা ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ১ হাজার ৫৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ১২৯ জন নিরপরাধ শিশু। সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন জাতিসংঘের তিন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষীও।
ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় অন্যান্য দেশ
যুদ্ধ কেবল ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরাকে অন্তত ১১৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ইরান ও লেবাননের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২৩ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১ জন সেনা সদস্য। বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে তাদের ১৩ জন সেনাকে হারিয়েছে, আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানেও প্রাণহানি ঘটেছে। সিরিয়া এবং সৌদি আরবের আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে বেশ কয়েকজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এমনকি উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন।
রেহাই পায়নি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও
এই সংঘাতের নির্মম ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশের ঘরেও। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ৩ এপ্রিলের ভয়াবহ সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত অন্তত ৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে দেশান্তরী হওয়া এই মানুষদের মৃত্যুতে দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
যুদ্ধবিরতি ও ভবিষ্যৎ
বুধবার ঘোষিত এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি মূলত মানবিক কারণে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে অবরুদ্ধ এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানো এবং আহতদের চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হবে। তবে দুই সপ্তাহ পর শান্তি স্থায়ী হবে নাকি পুনরায় বারুদের গন্ধে ভারী হবে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ, তা নিয়ে এখনো শঙ্কিত বিশ্ব সম্প্রদায়।

রয়টার্স 
























