ঢাকা , শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা এবং ট্রাম্পের শর্তযুক্ত যুদ্ধবিরতি

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হবে না : ইরান

সংগৃহীত ছবি

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবার এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো চাপের মুখে তারা তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসবে না। অন্যদিকে, পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার পথে ইরানের এই অগ্রযাত্রাকে রুখতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংশয়।

 

 

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অনড় তেহরান
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিজের দেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। আলজাজিরার বরাতে জানা গেছে, এসলামি বলেছেন, “ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কমানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, শত্রুপক্ষ বা আন্তর্জাতিক কোনো শক্তিই ইরানের এই প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অগ্রগতিকে সীমিত করতে সফল হবে না। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা খাতের জন্য। তবে পশ্চিমারা মনে করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যেই এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

 

হরমুজ প্রণালি ও ট্রাম্পের শর্ত
এদিকে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দরকষাকষি। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ জানিয়েছেন, মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ হলে ইরান পুনরায় এই প্রণালিটি খুলে দেবে। তিনি উল্লেখ করেন, “হরমুজ প্রণালি হাজার বছর ধরে উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা সংকটে তা বন্ধ করতে হয়েছে।” খাতিবজাদেহ আরও দাবি করেন, এই জলপথটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নয়, বরং এর নিরাপত্তা ও যাতায়াত অনেকটাই ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

 

 

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলা অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির পেছনে তিনি একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের সাফ কথা, স্থগিতাদেশ তখনই কার্যকর থাকবে যখন ইরান অবিলম্বে ‘সম্পূর্ণ এবং নিরাপদভাবে’ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।

 

 

ইসরায়েলের ক্ষোভ ও ভবিষ্যতের শঙ্কা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছে না ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রভাবশালী লিকুদ পার্টির সদস্য এবং প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিকাই চিকলি এই পদক্ষেপকে একটি ‘ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য লড়াইটি এই মুহূর্তেই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ইসরায়েলের এমন কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই সাময়িক বিরতি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে না, বরং বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

 

 

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের মতো। একদিকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজার এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মেগাস্টেডিয়ামে মেসির বিশ্বরেকর্ড: কাইল ফিল্ডে ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা এবং ট্রাম্পের শর্তযুক্ত যুদ্ধবিরতি

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হবে না : ইরান

Update Time : ০৫:২৬:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবার এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো চাপের মুখে তারা তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসবে না। অন্যদিকে, পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার পথে ইরানের এই অগ্রযাত্রাকে রুখতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংশয়।

 

 

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অনড় তেহরান
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিজের দেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। আলজাজিরার বরাতে জানা গেছে, এসলামি বলেছেন, “ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কমানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, শত্রুপক্ষ বা আন্তর্জাতিক কোনো শক্তিই ইরানের এই প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অগ্রগতিকে সীমিত করতে সফল হবে না। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা খাতের জন্য। তবে পশ্চিমারা মনে করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যেই এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

 

হরমুজ প্রণালি ও ট্রাম্পের শর্ত
এদিকে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দরকষাকষি। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ জানিয়েছেন, মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ হলে ইরান পুনরায় এই প্রণালিটি খুলে দেবে। তিনি উল্লেখ করেন, “হরমুজ প্রণালি হাজার বছর ধরে উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা সংকটে তা বন্ধ করতে হয়েছে।” খাতিবজাদেহ আরও দাবি করেন, এই জলপথটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নয়, বরং এর নিরাপত্তা ও যাতায়াত অনেকটাই ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

 

 

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলা অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির পেছনে তিনি একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের সাফ কথা, স্থগিতাদেশ তখনই কার্যকর থাকবে যখন ইরান অবিলম্বে ‘সম্পূর্ণ এবং নিরাপদভাবে’ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।

 

 

ইসরায়েলের ক্ষোভ ও ভবিষ্যতের শঙ্কা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছে না ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রভাবশালী লিকুদ পার্টির সদস্য এবং প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিকাই চিকলি এই পদক্ষেপকে একটি ‘ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য লড়াইটি এই মুহূর্তেই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ইসরায়েলের এমন কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই সাময়িক বিরতি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে না, বরং বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

 

 

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের মতো। একদিকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজার এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।